‘ক্রসফায়ার’ ও সাংবাদিক মন্তব্যে চাপে আইজিপি, নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের আলোচনা

Published: October 29, 2026, 5:45 am

অপরাধ দমনে সরকারের সবুজ সংকেত পেলে ‘ক্রসফায়ারে’ যেতে পুলিশ দ্বিধা করবে না—এমন মন্তব্য এবং সাংবাদিকদের সততা নিয়ে ঢালাও অভিযোগ তুলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তাঁর এই জোড়া মন্তব্যে রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন ও গণমাধ্যমকর্মীসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিতর্কের মুখে আইজিপি পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার জোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ইতিমধ্যে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্যের নথি তলব করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) পুরান ঢাকার চকবাজারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় বিতর্কের সূচনা করেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির। সেখানে তিনি বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন হলে এবং সরকার অনুমোদন দিলে ‘ক্রসফায়ার’ চালাতে পিছপা হবে না পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বলপ্রয়োগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশ কঠোর হলে একপক্ষ তাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে, আবার নিষ্ক্রিয় থাকলে ‘দুর্বল’ আখ্যা দেয়। তাই দায়িত্ব পালনে পুলিশকে উপযুক্ত পরিবেশ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বিষয়ে তিনি অভিযোগ করেন, মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সুবিধা বা অর্থ না পেলেই সাংবাদিকেরা পুলিশকে অকার্যকর বানিয়ে খবর প্রকাশ করেন।

আইজিপির এই বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পর সোমবার রাতেই পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি ব্যাখ্যামূলক বিবৃতি দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বোঝাতে নয়, বরং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগের রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সাংবাদিকদের নিয়ে মন্তব্যটি অসাবধানতাবশত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে প্রচলিত আইন ও বিধির আলোকে আইজিপির বক্তব্য মূল্যায়নের আহ্বান জানায়। সংগঠনটি উল্লেখ করে, আইন প্রয়োগে পুলিশের দ্বিধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়, তবে সব পদক্ষেপই আইনের সীমার মধ্যে ও পেশাদারত্বের সঙ্গে হতে হবে।

তবে পুলিশ সদর দপ্তরের ব্যাখ্যামেও বিতর্ক থামেনি। আইজিপির বক্তব্যকে সরাসরি নাকচ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করেছেন যে সরকার কোনোভাবেই ক্রসফায়ার সমর্থন করে না এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অটল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনের কঠোর প্রয়োগের কথা বলতে গিয়ে আইজিপি অসতর্কতাবশত এ কথা বলেছেন, যা বলা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম করে ক্ষমতায় আসা সরকারের আমলে পুলিশপ্রধানের মুখে এমন কথা অত্যন্ত বিব্রতকর। তিনি মনে করিয়ে দেন, প্রচলিত আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

আইজিপির বিষয়ে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, জাপান সফর শেষে আজ রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফেরার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, আইজিপিকে সরিয়ে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। এদিকে এই বক্তব্যের প্রতিবাদে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে অন্তত ১২টি সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংবাদিক সংগঠন। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) এবং ল রিপোর্টার্স ফোরাম (এলআরএফ) বক্তব্য প্রত্যাহার ও প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়ে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে। ক্ষমা না চাইলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ডিআরইউ ও ক্র্যাব।

এ ছাড়া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), অধিকার, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস), সু শাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, মায়ের ডাক ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ যৌথ ও পৃথক বিবৃতিতে আইজিপির বক্তব্যকে মৌলিক মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও সামাজিক সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ ড. নাবিলা ইদ্রিস মন্তব্য করেছেন, কেবল কর্মকর্তা পরিবর্তন করলেই এই সংস্কৃতির অবসান হবে না; বরং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে পুলিশপ্রধানের এই পদের ভবিষ্যৎ।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin