জাতীয় জাদুঘরে দর্শনার্থীদের টানছে জমিদারদের কারুকাজময় বিশাল পালঙ্ক

Published: November 2, 2026, 5:05 am

রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘরে চোখ মেললেই ভেসে ওঠে হাজার বছরের নানা ইতিহাস ও নিদর্শন। প্রাচীন মুদ্রা, পাথরের ভাস্কর্য কিংবা রাজা-বাদশাহদের ব্যবহৃত সামগ্রীর মাঝে দর্শনার্থীদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ কাঠের তৈরি বিশাল সব প্রাচীন পালঙ্ক। জাদুঘরের জাতিতত্ত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগের ৩১ ও ৩২ নম্বর কাঠের শিল্পকর্ম গ্যালারিতে প্রদর্শিত এই আসবাবগুলো যেন তৎকালীন বাঙালির আভিজাত্য ও শিল্পবোধের উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করছে। শিশু থেকে শুরু করে প্রবীণ—সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছেই এসব অলংকৃত পালঙ্কের বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে।

জাদুঘরের তথ্য মতে, পুরো ভবনের মধ্যে এই দুটি গ্যালারিতেই দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। সম্প্রতি এক বিকেলে পরিবার নিয়ে জাদুঘরে আসা ব্যবসায়ী রাকিব হাসান নিজের সন্তানদের এসব প্রাচীন আসবাব ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন। এ সময় তিনি জানান, শহরের শিশুরা তো সাধারণত পালঙ্ক চোখে দেখে না, তাই ওদের অতীত ইতিহাসের রূপকার এসব শিল্পকর্ম দেখাতে নিয়ে এসেছেন। সেখানে কাঠের বুকে খোদাই করা পরি, মৎস্যকন্যা, সিংহ ও বাঘের অবয়ব দেখে শিশুরা অনেক আনন্দ পেয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

গ্যালারিতে প্রদর্শিত পালঙ্কগুলোর মধ্যে ফরিদপুর ও নড়াইলের লোহাগড়ার জমিদারদের দুটি নিদর্শন দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে। ১৯৭৬ সালে জাতীয় জাদুঘরে সংগৃহীত হয় ফরিদপুরের জমিদারের ব্যবহৃত উনিশ শতকের একটি পালঙ্ক। ১২৩ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য ও ২৭ ইঞ্চি প্রস্থের এই রাজকীয় পালঙ্কের চারপাশের স্তম্ভ ও কাঠামো জুড়ে রয়েছে মানুষের অবয়ব, নারীমূর্তি, সিংহ, হরিণ এবং হাতির নিখুঁত খোদাই করা দৃশ্য।

অন্যদিকে, ১৯৭৮ সালে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার ইতনা গ্রাম থেকে সংগ্রহ করা হয় সেখানকার জমিদারের আরেকটি বিশাল পালঙ্ক। ১২৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য, ১০১ ইঞ্চি প্রস্থ এবং ১৩৩ ইঞ্চি উচ্চতার এই আসবাবের চার কোনায় রয়েছে পেঁচানো নকশার বড় আকারের চারটি কাঠের স্তম্ভ। এর পায়াগুলো তৈরি করা হয়েছে পরির আদলে এবং পেছনের অংশে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে লতাপাতা, ফুল ও উদ্ভিজ্জ নান্দনিক রূপ।

বাঙালি সংস্কৃতিতে কাঠ খোদাই বা দারুশিল্প লোকশিল্পের অত্যন্ত সমৃদ্ধ এক শাখা হিসেবে বিবেচিত। এসব পালঙ্ক কেবল ঘুমানো বা বিশ্রামের আসবাব ছিল না, বরং কারিগরদের অসামান্য শৈল্পিক দক্ষতা, ধর্মীয়-সামাজিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত রুচির প্রতিফলন ঘটত এতে। প্রাচীন সাহিত্যে খাট ও পালঙ্কের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী যাত্রাসিদ্ধি, সর্বসিদ্ধ, বিজয়া, অষ্টমঙ্গলা, জয়, মঙ্গল, প্রেয়ান, চিত্রকান্ত এবং মঞ্চ নামে নানা শ্রেনিকরণ পাওয়া যায়। ঐতিহ্যবাহী 'যুক্তি কল্পতরু' গ্রন্থে খাটকে দূরদর্শী, দীর্ঘদর্শী, দুর্লঙ্ঘ্য ও দুরাসদ—এই চার শ্রেণিতে ভাগ করে রাজাদের জন্য আরামদায়ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলায় ছেনি, হাতুড়ি আর বাটালির স্পর্শে কাঠ কেটে কেটে কাঠুরিয়া ও সূত্রধরেরা তৈরি করতেন অপূর্ব সব অলংকরণ। জাতীয় জাদুঘরের জাতিতত্ত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগের সাবেক কিপার (পরিচালক) জিনাত মাহরুখ বানুর ‘বাংলাদেশের দারুশিল্প’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, আসবাবের মূল গঠনে শাস্ত্রীয় রীতি অনুসৃত হলেও কারুকাজে ছিল শিল্পীর নিজস্ব স্বাধীনতার ছোঁয়া। উনিশ শতকে বিদেশি বণিক, পর্যটক ও প্রতিবেশী দেশের প্রভাবে দেশীয় আসবাবে ব্রিটিশ, রোমান, গ্রিক ও আরবি স্থাপত্যশৈলীর বিস্তার ঘটলেও বাংলার সূত্রধরেরা নিজেদের মৌলিকত্ব ধরে রেখেছিলেন।

সাবেক কিপার জিনাত মাহরুখ বানু জানান, অতীতে যশোর, খুলনা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, ফরিদপুর ও সিলেট অঞ্চলে উচ্চমানের অলংকৃত পালঙ্ক তৈরি হতো। ধনী ও জমিদারদের বাড়িতে মাসিক চুক্তিতে কাজ করতেন কারিগরেরা, যেখানে একেকটি পালঙ্ক নিখুঁতভাবে গড়তে দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেত। এসব আসবাব দীর্ঘস্থায়ী করতে কাঠ নির্বাচন ছিল অত্যন্ত জরুরি। মূলত সেগুন, কাঁঠাল, গর্জন, জারুল ও মেহগনি কাঠ দিয়েই এই মানসম্মত পালঙ্কগুলো নির্মিত হতো।

রাজকীয় পালঙ্কের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সিংহপায়া বা সিংহের থাবার মতো পায়া। খাটের মাথা ও পায়ার দিকে ত্রিমাত্রিক ও দ্বিমাত্রিক নকশায় লতাপাতা, গোলাপ, কলকা, ময়ূর, হংসজোড়া এবং পরির ছবি ফুটিয়ে তোলা হতো। বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরের স্টোরে ২১৪টি কাঠের শিল্পকর্ম সংরক্ষিত থাকলেও গ্যালারিতে খাট-পালঙ্ক ছাড়াও কাঠের অলংকৃত সিন্দুক, বেড়া, দরজা, পালকি, ঢেঁকি, সিংহাসন, চেয়ার ও নারী ভাস্কর্যসহ মোট ৪৬টি প্রাচীন নিদর্শন সর্বসাধারণের প্রদর্শনীতে রাখা রয়েছে।

কাঠের আসবাব হওয়ায় এগুলো আর্দ্রতার পরিবর্তন, ছত্রাক ও পোকামাকড়ের আক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে। নিদর্শনের ঐতিহাসিক মান ধরে রাখতে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ ও বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ আবশ্যক। জাতিতত্ত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগের কিপার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আসমা ফেরদৌসি জানান, গ্যালারির প্রতিটি নিদর্শন নিয়মিত তদারকি করা হয়। জাদুঘরের নিজস্ব গবেষণাগারে বিভিন্ন বস্তুর অবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo