বাংলাদেশে ক্রীড়াসামগ্রীর বাজারে কেন চীনা পণ্যের এত দাপট?

Published: September 26, 2026, 5:18 am

ফুটবল, ক্রিকেটের ব্যাট-প্যাড-গ্লাভস থেকে শুরু করে ব্যাডমিন্টন র‍্যাকেট, জিমের ট্রেডমিল কিংবা ওজন তোলার সরঞ্জাম—বাংলাদেশের ক্রীড়াসামগ্রীর বাজারে এখন সর্বত্রই চীনের আধিপত্য। রাজধানীর গুলিস্তান ও পল্টনের পাইকারি বাজার থেকে শুরু করে বড় বড় শোরুম এবং পেশাদার প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোতে চীনের তৈরি পণ্যের সরবরাহ দিন দিন বাড়ছে। ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের এই বিশাল বাজারের সিংহভাগই এখন চীনা পণ্যের দখলে চলে গেছে।

বাংলাদেশ স্পোর্টস গুডস মার্চেন্টস, ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ক্রীড়াসামগ্রীর বাজারের আকার প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার। এই চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ পণ্যই আমদানি করতে হয় এবং আমদানির একটি বড় অংশ আসে চীন থেকে। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষক সংস্থা ‘দ্য অবজারভেটরি অব ইকোনমিক কমপ্লেক্সিট’ (ওইসি)-এর ২০২৪ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই আমদানির হার আরও বেশি দেখানো হয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ তার মোট ক্রীড়াসামগ্রীর প্রায় ৮০ শতাংশই চীন থেকে আমদানি করে থাকে। শুধু ২০২৪ সালেই বাংলাদেশ চীন থেকে আনুমানিক ৩ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৪২৫ কোটি টাকার ক্রীড়াসামগ্রী আমদানি করেছে।

আমদানি করা এসব সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে জিম ও ফিটনেসের আধুনিক ট্রেডমিল, ওয়েটলিফটিং বারবেল ও হোম জিম সরঞ্জাম। এছাড়া ফুটবল, বাস্কেটবলসহ বিভিন্ন ইনডোর গেমসের বল ও অ্যাথলেটিকস আইটেম এবং ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস র‍্যাকেট ও ক্রিকেট গিয়ারের মতো সরঞ্জামও চীন থেকেই আসছে। শুধু খেলার সরঞ্জামই নয়, প্রতি চার বছর পর পর বিশ্বকাপ ফুটবল শুরুর আগে বাংলাদেশের বাজারে আসা জার্সির প্রায় পুরোটাই সরবরাহ করে চীন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের আগের পাঁচ মাসে ২৪টি দেশ থেকে মোট ২ লাখ ২২ হাজার জার্সি আমদানি করা হয়েছিল, যার মধ্যে ২ লাখ ১৭ হাজার জার্সিই এসেছে চীন থেকে। অর্থাৎ আমদানিকৃত জার্সির প্রায় ৯৮ শতাংশেরই উৎস ছিল চীন।

বাজার গবেষণাকারী সংস্থা আইমার্কের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে ফুটবলের বাজার ছিল ৩৫০ কোটি ডলারের। এই বাজারে শীর্ষস্থানে রয়েছে অ্যাডিডাস, পিউমা, নাইকি, ডিক্যাথেলন, ফ্রাঙ্কলিন ও ফরমেটিভের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো। আর এই ব্র্যান্ডগুলো ফুটবল বানানোর জন্য যে দেশগুলোকে বেছে নেয়, তার মধ্যে এক নম্বরে রয়েছে চীন। চীনের পরেই রয়েছে পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও জার্মানি।

ব্যবসায়ীদের কাছে চীনা ক্রীড়াসামগ্রীর এত জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ হলো এর সাশ্রয়ী দাম ও পণ্যের বৈচিত্র্য। বাংলাদেশের স্থানীয় উৎপাদকেরা এখনো মূলত সাধারণ মানের ক্রিকেট ব্যাট ও ফুটবলের মতো সীমিত কিছু পণ্য তৈরিতে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে চীনে একই সঙ্গে নিম্ন, মধ্যম ও উচ্চ মূল্যের অসংখ্য পণ্য তৈরি হয়। ফলে একজন আমদানিকারক একই সরবরাহ চেইন থেকে ফুটবল, ব্যাডমিন্টন র‍্যাকেট, গ্লাভস, জিমের সরঞ্জামসহ সব ধরনের সামগ্রী সহজেই সংগ্রহ করতে পারেন।

গুলিস্তান স্পোর্টস মার্কেটের ‘টি ওয়ার্ল্ড স্পোর্টস’-এর বিক্রেতা কাউসার হোসেন জানান, আগে ভালো মানের বিদেশি ফুটবল বা টেনিস র‍্যাকেট কিনতে সাধারণ ক্রেতাদের বেশ হিমশিম খেতে হতো। কিন্তু এখন চীনা পণ্যের সুবাদে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যেই আকর্ষণীয় ডিজাইন ও টেকসই ফুটবল বা গিয়ার সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।

বাংলাদেশ স্পোর্টস গুডস মার্চেন্টস, ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম আর শামিম জানান, বাংলাদেশে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ৪০ শতাংশের মতো, যা মূলত সাধারণ মানের ব্যাট ও ফুটবলেই সীমাবদ্ধ। তিনি বলেন, চীন যদি সাশ্রয়ী মূল্যে আধুনিক ও ডিজিটাল ক্রীড়া সরঞ্জাম সরবরাহ না করত, তবে আমাদের ক্রীড়া খাতের আধুনিকায়ন আরও কয়েক দশক পিছিয়ে যেত। চীনের এই সরবরাহ চেইনকে দেশের ক্রীড়া খাতের জন্য একটি বড় আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন তিনি।

এম আর শামিম আরও মনে করেন, চীনের উন্নত প্রযুক্তি, কাঁচামাল ও উৎপাদন দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে যৌথ উদ্যোগে কারখানা গড়ে তোলা সম্ভব। বিশেষ করে জার্সি, ক্রীড়া পোশাক, ব্যাগ, গ্লাভস ও কিছু প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বাজারটিকে আমদানিনির্ভর থেকে ধীরে ধীরে উৎপাদনমুখী করা যেতে পারে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo