রামলীলায় ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমাবেশ, সিইসি জ্ঞানেশ ও মোদি-শাহর বিচারের দাবি

Published: November 1, 2026, 2:37 pm

ভারতে ভোট জালিয়াতি বন্ধ, দেশ ও সংবিধান সুরক্ষার দাবিতে রাজধানী দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিশাল সমাবেশ করেছে মোদিবিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। ‘ভোট বাঁচাও দেশ বাঁচাও’ শিরোনামের এই বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের পাশাপাশি ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া বাতিলের জোর দাবি জানানো হয়। বিরোধী নেতাদের মতে, এই আন্দোলন কোনো একক রাজনৈতিক দল বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নয়; এটি ভারতের প্রতিটি গণতন্ত্রপ্রেমী নাগরিকের অস্তিত্বের সংগ্রাম। সিইসিকে সরানোর পর মোদি-শাহ জুটিকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনরুদ্ধার করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য।

সমাবেশের সমাপনী বক্তব্যে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী কঠোর সুর চড়ে বলেন, জ্ঞানেশ কুমারের মতো কর্মকর্তাদের ওপর ভর করেই নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ ক্ষমতা ধরে রেখেছেন। প্রায় ১৫ শতাংশ ভোটারের নাম বাদ দিয়ে এই ভোট চুরি বাস্তবায়ন করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, সিইসি জ্ঞানেশ যা করেছেন তা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল এবং তাঁকে কারাদণ্ড ভোগ করতেই হবে। রাহুল স্পষ্ট করেন, যত শক্তিশালী বা বিত্তশালীই হোক না কেন, সংবিধানের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। জ্ঞানেশের পদত্যাগের পর মোদি ও অমিত শাহর অপরাধেরও বিচার করা হবে এবং তাঁদের পালিয়ে যেতে দেওয়া হবে না।

রবিবার দুপুর ১২টায় কনট প্লেস-মিন্টো রোড ক্রসিং থেকে শুরু হয় বিরোধী নেতাদের সুসজ্জিত গাড়ির বহর। মল্লিকার্জুন খাড়গে, রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব, ফারুক আবদুল্লাহ, মেহবুবা মুফতি, সুপ্রিয়া সুলে, কল্পনা সোরেন, সঞ্জয় রাউত, দীপংকর ভট্টাচার্য ও এম এ বেবির মতো শীর্ষ নেতারা খোলা হুডের গাড়িতে চেপে রামলীলা ময়দানের দিকে রওনা হন। প্রায় পৌনে দুই কিলোমিটারের এই যাত্রাপথে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক। শোভাযাত্রাটি সভাস্থলে পৌঁছাতে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। তবে বিরোধী প্রতিনিধি দল পৌঁছানোর আগেই রামলীলা ময়দান লাখো মানুষের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেলে প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দেওয়া হয়, ফলে বাইরে আশপাশের রাস্তায় অবস্থান নেন বিপুলসংখ্যক সমর্থক।

শারীরিক অসুস্থতার কারণে শোভাযাত্রায় হাঁটতে না পারলেও সমাবেশের আগেই সভাস্থলে পৌঁছে যান কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। সমাবেশে বক্তব্যে না রাখলেও তাঁর উপস্থিতি কর্মীদের উজ্জীবিত করে। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো কংগ্রেস নেতা শশী থারুর মঞ্চে উঠে বলেন, সিইসি জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে দেশের সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন। জনগণের কোনো আস্থা নেই তা অনুধাবন করে তাঁর অবিলম্বে ইস্তফা দেওয়া উচিত। সভা সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন দিল্লি কংগ্রেস নেতা অজয় মাকেন।

দিল্লি পুলিশের বেধে দেওয়া কড়া শর্ত অনুযায়ী সমাবেশ বিকেল পাঁচটার মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা ছিল। ফলে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বিরোধী জোটের প্রতিটি রাজনৈতিক নেতাকে সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট করে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ অভিযোগ করেন, পাকিস্তানপন্থী আখ্যা দিয়ে এসআইআর প্রক্রিয়ায় বেছে বেছে মুসলিম ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নিজ রাজ্যে দেড় কোটি হিন্দু ভোটারের নাম কাটার দাবির প্রসঙ্গ টেনে ফারুক প্রশ্ন তোলেন, তবে কি ওই হিন্দুরাও পাকিস্তানপন্থী?

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ এনে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল হারেনি, বরং চক্রান্ত করে হারানো হয়েছে। সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ আখ্যা দিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, জ্ঞানেশকে পদ ছাড়তেই হবে এবং তাঁর সঙ্গে বিজেপি সরকারকেও বিদায় নিতে হবে। সমাজবাদী পার্টি প্রধান অখিলেশ যাদব বলেন, বিজেপি শুধুমাত্র নিজেদের সমর্থকদের দিয়ে ভোট দেওয়ানোর জন্য নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করছে। উত্তর প্রদেশ থেকে বিজেপির উত্থান হয়েছিল এবং বারাণসীর ফলাফলের মধ্য দিয়ে তাদের পতনও সেখান থেকেই শুরু হয়ে গেছে।

বিহারের আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে মহাভারতের শকুনি মামার চালবাজির সঙ্গে তুলনা করে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা চুরির অভিযোগ তোলেন। অন্যদিকে মেহবুবা মুফতি সতর্ক করে বলেন, সিইসি জ্ঞানেশ পদত্যাগ না করলে দেশের অখণ্ডতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। সমাবেশে সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের দীপংকর ভট্টাচার্য, সিপিএম নেতা এম এ বেবি এবং ছাত্র সংগঠন ‘আইসা’ নেত্রী নেহা বোরা বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

দিল্লির এই সফল সমাবেশের মাধ্যমে ইন্ডিয়া জোট ভোট চুরির বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনকে নতুন গতি দিল। বিভিন্ন রাজ্যের রাজধানীতে পর্যায়ক্রমে জনসভা আয়োজনের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, দিল্লির এই সমাবেশ ছিল তার প্রথম ধাপ। পাশাপাশি আগামী বছরের শুরুতে হতে যাওয়া পাঞ্জাব, উত্তরাখণ্ড ও উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের অনানুষ্ঠানিক প্রচারণাও এই রামলীলা ময়দান থেকেই শুরু করে দিলেন বিরোধী জোটের নেতারা।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo