জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া ব্যয়, সরকারি ব্যয় সংকোচন নীতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তরুণদের উপেক্ষা করার অভিযোগে ইউরোপজুড়ে ফের ফুঁসে উঠেছেন জেন-জি তরুণরা। শনিবার হ্যালোইন উদ্যাপনের রাতের অন্ধকার নেমে আসার পর পরই ফ্রান্স, জার্মানি ও পোল্যান্ডের রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘাত, নজিরবিহীন লুটপাট, পেট্রলবোমা হামলা এবং পোল্যান্ডের সাংবিধানিক সংকটকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। একই রাতে শ্রমিকের মজুরি বাড়ানো ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে ইতালিতেও রাজপথে নামেন হাজার হাজার মানুষ।
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিসহ নানামুখী অসন্তোষ নিয়ে রাজপথে নামা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে বিভিন্ন শহরের পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। বিকেল পর্যন্ত বিক্ষোভের অধিকাংশ মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও সন্ধ্যার দিকে প্যারিস, লিওঁ ও তুলুজ শহরে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। এ ছাড়া মার্সেই শহরেও মিছিলের শেষভাগে উত্তেজনা দেখা দেয়। সংঘাতের ঘটনায় দেশজুড়ে অন্তত ৫৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ এবং চারজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার আগে দিনটিতে অন্তত ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন বলে জানায় দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, সহিংসতার বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর জবাব দিতে প্রস্তুত ছিল।
ফ্রান্সে গত ১৭ অক্টোবরের দাঙ্গার পর এটি ছিল টানা তৃতীয় সপ্তাহের বিক্ষোভ। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সরকার যখন ঋণের বোঝা কমানোর চাপে রয়েছে, ঠিক তখনই এ সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হলো। ফ্রান্সের সরকারি ঋণ বর্তমানে জিডিপির প্রায় ১২০ শতাংশের কাছাকাছি এবং শুক্রবার ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা ‘ফিচ’ দেশটির ঋণের ভবিষ্যৎ অবস্থান ‘নেতিবাচক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আন্দোলনকারীদের পক্ষে প্যারিসের বিক্ষোভকারী জেরোম রদ্রিগেজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে সাধারণ পরিবারগুলো মাত্র কয়েক সেন্টের জন্য সংগ্রাম করছে। শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পদ্ধতির জটিলতা নিয়ে শুরু হওয়া এ আন্দোলনে পরবর্তীতে শ্রমিক সংগঠন ও পুনরুজ্জীবিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকারীরাও শামিল হন।
জার্মানিতেও ‘জেনজি রেগেল্ট!’ নামের সংগঠনের ডাকে ১০ হাজারের বেশি তরুণ রাজপথে নামেন। হ্যালোইন হওয়ায় অনেকে ডাইনোসর ও ব্যাটম্যানের বিচিত্র পোশাক পরে এবং ‘প্রতিরোধের সময় এখন’ ও চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসকে লক্ষ্য করে ‘মের্ৎসকে বিদায় নিতে হবে’ লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে অংশ নেন। তবে সন্ধ্যার পর বার্লিন, কোলন, হামবুর্গ ও ফ্রাঙ্কফুর্টে ব্যাপক সংঘাত শুরু হয়। ফ্রাঙ্কফুর্টে মুখোশধারীরা একাধিক দোকানে লুটপাট চালায় এবং জরুরি সেবা কর্মীদের লক্ষ্য করে পাথর, আতশবাজি ও পেট্রলবোমা ছোড়ে। জবাবে পুলিশ জলকামান ও পিপার স্প্রে ব্যবহার করে। ডেনমায়ারে পুলিশ হেলিকপ্টার থেকে নজরদারি চালানো হয় এবং প্রধান কেনাকাটার এলাকার সড়ক বন্ধ রাখা হয়। হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোসেক জানান, ফ্রাঙ্কফুর্টে চিহ্নিত প্রায় ১০০ জন বামপন্থী উগ্রবাদী অনুপ্রবেশ করায় এ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া বার্লিনে পুলিশকে লক্ষ্য করে ডিম ও বোতল ছোড়া হয় এবং বনে এক পুলিশ সদস্য সামান্য আহত হন।
পোল্যান্ডে দেশের সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রধানকে পদ থেকে অব্যাহতির প্রতিবাদে টানা দ্বিতীয় রাতের মতো বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশটির ইউরোপপন্থী প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যদিও বিরোধীপক্ষ একে ‘অভ্যুত্থান’ আখ্যা দিয়েছে। ঘটনার মধ্যে শুক্রবার সেনেগালগামী সফর বাতিল করে মাঝপথ থেকে উড়োজাহাজ ঘুরিয়ে দেশে ফেরেন দেশটির প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি। তিনি নিজে গিয়ে সাময়িকভাবে অপসারিত আদালত প্রধানকে ভবনে প্রবেশ করতে সাহায্য করেন। সেখানে শুক্রবারে আদালত ভবনের বেড়া ভাঙার চেষ্টার অভিযোগে তিন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
অন্যদিকে ইতালিতেও তরুণ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে বড় ধরনের বিক্ষোভ ও ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, সরকারি সেবা খাত জোরদার এবং জীবনযাত্রার সংকট সমাধানের পাশাপাশি দেশে সামরিক খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান।





