৫ আগস্ট কি গণঅভ্যুত্থান নাকি বিপ্লব? বিশ্লেষণে ইতিহাস ও যুক্তি

Published: September 27, 2026, 4:36 am

২০২৪ সালের ৫ আগস্টে কী ঘটেছিল তা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি রয়েছে। কেউ একে গণঅভ্যুত্থান, আবার কেউ বিপ্লব হিসেবে অভিহিত করছেন। এমনকি অনেক বিদগ্ধ ব্যক্তিও বক্তৃতা, বিবৃতি ও লেখায় এ নিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলছেন, যার ফলে সাধারণ জনগণ বিভ্রান্ত হচ্ছেন। ইতিহাস, তথ্য ও যুক্তির নিরিখে বিষয়টি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

গণঅভ্যুত্থান হলো সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও গণজোয়ারে গড়ে ওঠা আন্দোলন, যা মূলত কোনো শাসক বা সরকারের পতন ঘটায়। এটি কোনো রাষ্ট্র বা প্রচলিত শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের বৃহৎ পরিসরের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ। সাধারণত দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিপীড়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ব্যাপক দুর্নীতি ও অবৈধভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার প্রতিক্রিয়ায় যখন নাগরিকরা রাজপথে নেমে আসে, তখন তা গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়। সহজ কথায়, এটি ক্ষমতা বদলের এক বিস্ফোরণ। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা (People’s Mass Participation), তাৎক্ষণিক অসন্তোষ ও তার দ্রুত বিস্তার, বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতিরোধ এবং যৌথ নেতৃত্ব (Shared leadership)। এছাড়া এর মূল উপাদানসমূহ হলো যৌথ সামাজিক পরিচয় (Shared Social Identity), নির্দিষ্ট দাবি বা ইশতেহার—যেমন ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদের ১১ দফা—ক্ষোভের বৈধতা এবং ট্রিগার পয়েন্ট বা অনুঘটক।

গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে মিশরের প্রো-ডেমোক্রেসি মুভমেন্টের নেতা ওয়ায়েল ঘনিম বলেন, “The power of the people is much stronger than the people in power” (অর্থাৎ ক্ষমতাসীনদের চেয়ে জনগণের শক্তি অনেক বেশি শক্তিশালী)। গণঅভ্যুত্থানের শক্তি হচ্ছে জনগণের ঐক্যবদ্ধতা, যা সরকারের পতন নিশ্চিত করে। আমেরিকার সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতা আব্বি হফম্যানের ভাষায়, “When the people stand up, the government has to sit down” (অর্থাৎ জনগণ যখন রুখে দাঁড়ায়, তখন সরকারকে পিছু হটতে হয়)। ইতিহাসের পাতায় ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, যার ফলে আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটে; ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান, যার ফলে এরশাদের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে; এবং ২০১০-২০১১ সালের আরব বসন্ত, যার ফলে তিউনিসিয়া, মিশর ও লিবিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে একনায়কতন্ত্রের পতন ঘটে, এগুলো গণঅভ্যুত্থানের উদাহরণ।

অন্যদিকে, বিপ্লব হলো সমাজ ব্যবস্থার কাঠামোগত ও মৌলিক পরিবর্তন, যা শুধু সরকার বদলায় না বরং পুরো সিস্টেম বা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বদলে দেয়। এটি প্রচলিত শাসনব্যবস্থা ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়। বিপ্লবে দীর্ঘমেয়াদী আদর্শ, পরিকল্পনা ও কাঠামোগত রূপান্তর ঘটে। এর প্রধান উপাদানসমূহ হলো ব্যাপক জন-অসন্তোষ (People’s Mass Frustration), বিকল্প বৈপ্লবিক আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি (Alternative Revolutionary Ideology), নেতৃত্ব ও বিপ্লবী সংগঠন (Leadership and Revolutionary organisation), শাসকগোষ্ঠীর সংকট ও দুর্বলতা (State Crisis) এবং গণঅভ্যুত্থান ও সংহতি (Mass Mobilisation)। বিপ্লবের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো আমূল পরিবর্তন (Radical Change), জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ (Mass Participation), দ্রুত গতি (Rapid Transition), সহিংসতার উপস্থিতি বা সম্ভাবনা এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব (Farsighted Impact)।

আমূল পরিবর্তনের ব্যাপারে মার্কিন দার্শনিক গ্রেস লি বগস বলেন, “Revolution is about the need to evolve, not just a desire to protest” (অর্থাৎ বিপ্লব মানে বিবর্তিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা, কেবল প্রতিবাদ করার আকাঙ্ক্ষা নয়)। কিউবার বিপ্লবের নায়ক চে গুয়েভারার ভাষায়, “The revolution is not an apple that falls when it is ripe. You have to make it fall” (অর্থাৎ বিপ্লব এমন কোনো আপেল নয়, যা পেকে গেলেই নিজে থেকে নিচে পড়ে যায়; একে নিচে নামিয়ে আনতে হয়)। ইতিহাসে ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯), রুশ বিপ্লব (১৯১৭), ইরানি বিপ্লব (১৯৭৯) এবং চীন বিপ্লব (১৯১১) হলো বিপ্লবের উদাহরণ।

উপরের তথ্য ও ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ৫ আগস্ট একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান ছিল। কারণ এতে গণঅভ্যুত্থানের সব উপাদান ও বৈশিষ্ট্য উপস্থিত ছিল। কোটা পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সরকার পতনের এক দফায় রূপ নেয় এবং দল, মত ও ধর্ম নির্বিশেষে সবাই রাস্তায় নেমে আসে। এর মাধ্যমে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের দীর্ঘ স্বৈরশাসন ও ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটে। তবে একে বিপ্লব বলা কঠিন, কারণ বিপ্লবের অনেক বৈশিষ্ট্য ও উপাদান সেখানে অনুপস্থিত ছিল। বিপ্লবের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো বৈপ্লবিক সংগঠন ও নেতৃত্ব, যা ৫ আগস্টের ঘটনায় ছিল না। এছাড়া বিপ্লবের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আমূল পরিবর্তন, কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঠামোর কোনো আমূল পরিবর্তন ঘটেনি বা ঘটার কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না। বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য বিপ্লবী সংগঠন ও নেতৃত্ব, যার কোনটিই ৫ আগস্টের ঘটনায় ছিল না। তাই এই পরিবর্তনকে কোনোভাবেই বিপ্লব বলা যাবে না, এটি ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান।

আমেরিকার সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতা Abbie Hoffman—এর ভাষায় “When the people stand up, the government has to sit down” (অর্থাৎ “জনগণ যখন রুখে দাঁড়ায়, তখন সরকারকে পিছু হটে”।)ইতিহাসের পাতায় কয়েকটি গণঅভ্যুত্থানের উদাহরণ: (১) ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান যার ফলে আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং অল্পদিনের মধ‍্যে স্বাধীন “বাংলাদেশ” নামে নতু

ইতিহাসে বিপ্লবের কয়েকটি উদাহরণ: (১) ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯)- এটি ফ্রান্সের রাজতন্ত্র এবং সামন্তবাদের অবসান ঘটিয়ে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে, (২) রুশ বিপ্লব (১৯১৭)-বলশেভিকদের নেতৃত্বে রাশিয়ায় জার শাসনের অবসান ও সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা, (৩) ইরানি বিপ্লব (১৯৭৯)-এই বিপ্লব ইরানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত করে, (৪) চীন বি

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin