কিশোর গ্যাং কালচার রুখতে প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধ

Published: September 25, 2026, 3:43 am

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাং কালচার এখন একটি ভয়াবহ সামাজিক ও জাতীয় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাড়া-মহল্লায় চাঁদাবাজি ও ছিনতাই থেকে শুরু করে খুন পর্যন্ত করতে দ্বিধা করছে না এসব বেপরোয়া কিশোর-তরুণরা। সম্প্রতি কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের সশস্ত্র আস্ফালন নাগরিক জীবনকে চরম অনিরাপদ করে তুলেছে। ব্যস্ত সড়কে দেশীয় ও আধুনিক অস্ত্র উঁচিয়ে দিনদুপুরে মহড়া দেওয়ার ঘটনা কেবল পথচারী ও যানবাহনের মধ্যেই আতঙ্ক ছড়াচ্ছে না, বরং এটি সভ্য সমাজের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর একটি বড় চপেটাঘাত।

তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা মহানগরী ও এর আশপাশের উপজেলাগুলোতেই অন্তত ২৫টি সক্রিয় কিশোর গ্যাং তৎপর রয়েছে। মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সংগঠিত হওয়া এসব দলের সদস্যরা মাদক সেবন, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের পাশাপাশি প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার মতো নৃশংসতায় লিপ্ত হচ্ছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার ছেলে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড এবং অতীতে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনাগুলোই এর প্রমাণ। তুচ্ছ বিরোধ, টিকটককেন্দ্রিক রেষারেষি ও সামাজিক বিদ্বেষের জেরে স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোরদের হাতে বই-খাতার বদলে উঠে আসছে চাপাতি, সুইচ গিয়ার ও আগ্নেয়াস্ত্রের মতো মারাত্মক সব অস্ত্র।

এই সর্বনাশা পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে এক শ্রেণির রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী ‘বড় ভাইদের’ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ। নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে এবং হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে এই অপরিণত কিশোরদের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়ার কারণেই এই কিশোররা আইনের কোনো তোয়াক্কা করছে না। পুলিশ মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার করলেও ঘটনার পুনরাবৃত্তি থামছে না। কারণ, গ্যাং কালচারের মূল শিকড় এখনও উপড়ানো সম্ভব হয়নি। মাঠপর্যায়ের বিভ্রান্ত কিশোরদের সাময়িক আটকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসবে না; বরং যারা এদের পেছনে থেকে অর্থ, অস্ত্র ও নিরাপত্তা জোগাচ্ছে, সেই নেপথ্য কুশীলবদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।

কিশোরদের এই বিপথগামী হওয়ার পেছনে পরিবার ও সমাজের দায়িত্বহীনতাও কম দায়ী নয়। সন্তানদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ, দামি মোটরসাইকেল ও অবাধে স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া এবং তাদের চলাফেরার ওপর নজর না রাখা অপরাধের পথকে আরও সহজ করে দিচ্ছে। পরিবারে নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা কমে যাওয়া এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার কারণে তরুণরা সহজে অপরাধের দিকে ঝুঁকছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শিক্ষক ও সচেতন নাগরিক সমাজকে সম্মিলিতভাবে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কেবল রুটিনমাফিক ধরপাকড়েই সীমাবদ্ধ না থেকে গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশু-কিশোরদের সাধারণ বন্দিদের সঙ্গে না রেখে কার্যকর কিশোর সংশোধন প্রক্রিয়ার আওতায় আনা প্রয়োজন, যাতে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ পায়। কুমিল্লাসহ দেশের কোনো জনপদকেই কিশোর অপরাধীদের অভয়ারণ্য হতে দেওয়া যায় না। জনমনে শান্তি ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় উপেক্ষা করে এই গ্যাং কালচারের মূলোৎপাটন করতে হবে। আগামী প্রজন্মকে রক্ষায় সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সমন্বিতভাবে সোচ্চার হতে হবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Dainik Amader Shomoy