পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা, উন্নয়ন, ভূমি বিরোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মতো দীর্ঘদিনের জটিল বিষয়গুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে সরকার উচ্চপর্যায়ের তিনটি কমিটি গঠন করেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারিকৃত পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে গঠিত এই কমিটিগুলোর লক্ষ্য হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন করা। এই উদ্যোগটি পাহাড়ের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর টেকসই সমাধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সরকারের এই নতুন কাঠামোয় নিরাপত্তা, ভূমি, প্রশাসন, উন্নয়ন, সীমান্ত সুরক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে একই প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা হয়েছে। জাতীয়, নির্বাহী ও পরামর্শক—এই তিন স্তরের কমিটি গঠনের ফলে নীতিনির্ধারণ, বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত গ্রহণের মধ্যে সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয় কমিটি, স্বরাষ্ট্রসচিবকে সভাপতি করে নির্বাহী কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরামর্শক কমিটিকে দুই মাসের মধ্যে উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সন্ত্রাস দমনের বিষয়ে সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে। এরপর নির্বাহী কমিটি তিন মাসের মধ্যে জাতীয় কর্মকৌশলের খসড়া তৈরি করবে, যা জাতীয় কমিটি চূড়ান্ত করবে।
নির্বাহী কমিটিকে প্রচলিত আইন ও চুক্তির শর্তাবলি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংস্কারের সুপারিশ করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরামর্শক কমিটিতে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন কাঠামো, উন্নয়ন বোর্ড এবং আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদের প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়েছে, যা মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় সহায়ক হবে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা এবং গোয়েন্দা নিয়ন্ত্রণমুক্তভাবে কমিটি পুনর্গঠন জরুরি।
পাহাড়ে সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং সংঘাতের কারণে সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে, এই সমন্বিত উদ্যোগ তার সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে, পাহাড়ি অঞ্চলের জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় বাস্তবায়নাধীন ‘জলবায়ু সহনশীল জীবিকা উন্নয়ন ও পার্বত্য চট্টগ্রামে জলাধার’ প্রকল্পের আওতায় ৫৭ কোটি ৯০ লাখ ১৭ হাজার ৬৫২ টাকা ব্যয়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের সুপারিশ করেছে। এই প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, এটি চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, খুমি, লুসাইসহ প্রায় ১৩টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত আবাসভূমি। দীর্ঘদিনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন নীতি গ্রহণ অপরিহার্য। শান্তি ও সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে হলে বিভাজনমূলক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে সংলাপ এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চর্চা বাড়াতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে জাতীয় ঐক্যের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়ে তোলাই সরকারের বর্তমান লক্ষ্য।





