ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকালে আমাদের মনে হয় সময় নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে যাচ্ছে—এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, তিন সেকেন্ড। সকাল আসে, দুপুর যায়, রাত নামে। আমরা বড় হই, পুরোনো ছবি দেখি এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করি। আমাদের কাছে বিষয়টি এতটাই স্বাভাবিক যে এ নিয়ে প্রশ্ন করাই অদ্ভুত মনে হতে পারে। কিন্তু একটু থামলে প্রশ্ন জাগে, সত্যিই কি সময় নামে কোনো কিছু আছে? আর যদি থাকে, তা কি সত্যিই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বয়ে যায়?
এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে মানুষ প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে তর্ক করছে। আমরা সাধারণত সময়কে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতে ভাগ করি। কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে তিনটিই অদ্ভুত হয়ে ওঠে। যা ঘটেছে, তা তো আর এখন নেই; আমাদের কাছে আছে শুধু তার স্মৃতি, বই, ছবি, ভিডিও বা অন্য কোনো রেকর্ড। ভবিষ্যতের ঘটনাগুলোও এখনো ঘটেনি, সেগুলো আমাদের বর্তমান চিন্তার মধ্যেই আছে। এমনকি 'এখন' মুহূর্তটি কতক্ষণ স্থায়ী, তা নিয়েও সংশয় আছে। বর্তমানকে যদি নিখুঁতভাবে ধরতে চাওয়া হয়, তবে তা যেন আলো ও অন্ধকারের মাঝের এক অতি সূক্ষ্ম সীমারেখা, যার কোনো দৈর্ঘ্য নেই। এখান থেকেই সময়ের অস্তিত্ব অস্বীকার করার যুক্তিটি আসে।
অন্যদিকে 'চিরন্তনবাদ' বা 'ব্লক ইউনিভার্স'-এর ধারণা অনুযায়ী অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—তিনটিই সমানভাবে বাস্তব। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বের পর এই ধারণাটি বিশেষ গুরুত্ব পায়, যেখানে সময়কে মহাকাশের মতোই চতুর্থ মাত্রা হিসেবে দেখা হয়। আইনস্টাইন নিজেই বলেছিলেন, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পার্থক্য আসলে এক ধরনের 'একগুঁয়ে ও স্থায়ী মায়া'। এছাড়া 'প্রেজেন্টিজম' বা বর্তমানবাদের মতে শুধু বর্তমানই বাস্তব, আবার 'গ্রোয়িং ব্লক ইউনিভার্স' ধারণা বলছে অতীত ও বর্তমান বাস্তব হলেও ভবিষ্যৎ এখনো তৈরি হয়নি, বরং তা ধীরে ধীরে বাস্তবে যুক্ত হচ্ছে।
তাপমাত্রার ধারণার মতোই সময় হয়তো মহাবিশ্বের গভীর স্তরে আলাদা কোনো মৌলিক বস্তু নয়, বরং অসংখ্য অণুর সম্মিলিত আচরণ থেকে পাওয়া একটি ধারণা। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে দক্ষিণ ইতালির দার্শনিক পারমেনিদিস বলেছিলেন, পরিবর্তন আসলে অসম্ভব। তাঁর ছাত্র জেনোও সময়ের প্রবাহ নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছিলেন। বিপরীতে হেরাক্লিটাস বিশ্বাস করতেন সবকিছুই প্রবাহিত হচ্ছে, সবকিছুই 'হয়ে উঠছে'। নদীর জলে তুমি একবার পা রাখলে, পরের মুহূর্তে সেই নদী আর আগের মতো থাকে না। আইজ্যাক নিউটন সময়কে দেখেছিলেন পরিবর্তনের বাইরের এক পরম পটভূমি হিসেবে, যা পৃথিবীতে কিছুই পরিবর্তন না হলেও নিজের গতিতে চলতে থাকবে।
পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণে সময় সাধারণত 't' নামক একটি চলক বা প্যারামিটার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আমরা বিভিন্ন মুহূর্তের আলাদা আলাদা ছবি পাই, কিন্তু প্রতিটি ফ্রেম নিজে স্থির। চলচ্চিত্রের স্থির ছবিগুলো দ্রুত চললে যেমন প্রবাহের ভ্রম তৈরি হয়, তেমনি পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণেও এমন কোনো রহস্যময় স্রোত দেখা যায় না যা অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে বয়ে যাচ্ছে। আপেক্ষিকতার তত্ত্বে পর্যবেক্ষকের গতি বা মহাকর্ষের কারণে সময়ের ব্যবধান ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সেখানেও কোনো অদৃশ্য নদীর সন্ধান পাওয়া যায় না।
তাহলে আমরা যে সময়ের প্রবাহ এত স্পষ্টভাবে অনুভব করি, সেটি কী? সম্ভবত আমাদের মস্তিষ্কের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক আছে। আমরা স্মৃতি ধরে রাখি, বর্তমানকে অনুভব করি, ভবিষ্যৎ কল্পনা করি। ফলে আমাদের জীবনের গল্পটি একটি ধারাবাহিক পথের মতো মনে হয়। বিজ্ঞান এখনো এই প্রবাহের কোনো সরাসরি ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। হয়তো আমাদের অনুভূতিতে কিছু একটা বাদ পড়ছে, অথবা পদার্থবিজ্ঞানের বর্তমান তত্ত্বগুলো বাস্তবতার সম্পূর্ণ ছবি নয়। ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকানোর পরও সবচেয়ে সহজ প্রশ্নটিই সবচেয়ে কঠিন থেকে যায়—সময় কি সত্যিই বয়ে যায়, নাকি আমরা শুধু বয়ে যাওয়ার অনুভূতিটুকু নিয়ে বেঁচে আছি?
আবার অন্য একটি দল ঠিক বিপরীত কথা বলে। তাদের ধারণার নাম ‘চিরন্তনবাদ’। এই ধারণা অনুযায়ী অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—তিনটিই সমানভাবে বাস্তব। আমরা হয়তো এখন ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু ১৯২৬ বা ২১২৬-ও বাস্তবতার কাঠামোর মধ্যে কোনো না কোনোভাবে বিদ্যমান।
তাপমাত্রার কথাই ধরো। একটি ঘরের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস—এটি আমাদের কাছে অর্থপূর্ণ। কিন্তু একটি মাত্র অণুর কি তাপমাত্রা আছে? আসলে তাপমাত্রা হলো অসংখ্য অণুর সম্মিলিত আচরণ থেকে পাওয়া একটি ধারণা। একইভাবে, হয়তো সময়ও মহাবিশ্বের আরও গভীর স্তরে গিয়ে আলাদা কোনো মৌলিক বস্তু হিসেবে টিকে থাকে না।





