রাজধানীর বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের মতো সুরক্ষিত এলাকার ফুটপাতে বেপরোয়া গতির একটি বিলাসবহুল প্রাইভেটকারের নিচে পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান বাক-প্রতিবন্ধী নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীম। এই নির্মম ঘটনার পর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার কথা থাকলেও, শেষ পর্যন্ত তা আদালত প্রাঙ্গণে মাত্র ৯ লাখ টাকার এক আপসনামায় গিয়ে ঠেকেছে। দাফন-কাফনের জন্য ১ লাখ এবং মা-বাবার জন্য ৮ লাখ টাকার বিনিময়ে আসামির জামিনে আপত্তি না করার এই রফাদফা দেশের বিচারব্যবস্থা ও ভঙ্গুর সামাজিক বিচারবোধের এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছে। বিপুল অর্থের বিনিময়ে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার এই চেষ্টা সমাজে এক বিপজ্জনক নজির স্থাপন করছে।
এই ট্র্যাজেডির শুরু থেকেই পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে চরম পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে, ১৭ বছরের এক লাইসেন্সহীন কিশোর গাড়িটি চালিয়ে এনে ফুটপাতে তুলে দেয় এবং তার পাশে বসা ছিলেন তাদের নিযুক্ত চালক। কিশোরটি চালকের আসন থেকে বের হতে দেখা গেলেও গুলশান থানা পুলিশ মূল এজাহারে তাকে আড়াল করে ফেলে। বারিধারার মতো কড়া নজরদারিতে থাকা এলাকার ফুটেজ হাতে থাকার পরও পুলিশ ৪৪ বছর বয়সী চালক আকাশ মারককে প্রধান আসামি বানিয়ে মামলা দায়ের করে। ঘটনার প্রথম প্রহর থেকেই প্রভাবশালী অপরাধীকে বাঁচাতে প্রক্সি চালক দাঁড় করানোর এই আইনি নাটক প্রাতিষ্ঠানিক গাফিলতিরই প্রমাণ দেয়।
তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশের চরম অবহেলাও স্পষ্ট হয়েছে। লাইসেন্স ছাড়া এক কিশোর কীভাবে এত বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে ফুটপাতে উঠে গেল, ঘটনার সময় সে কোনো বিপজ্জনক মাদকের প্রভাবে ছিল কি না—তা জানার জন্য কোনো ডোপ টেস্ট বা রক্ত পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেছেন যে, গাড়ি থেকে হর্ন দেওয়া সত্ত্বেও নিহত ব্যক্তি বাক-প্রতিবন্ধী হওয়ায় সরতে পারেননি। ফুটপাত যেখানে পথচারীদের জন্য নিরাপদ জায়গা, সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষকে চাপা দেওয়ার অধিকার কোনো চালকের নেই। তদন্তের এমন শিথিলতার কারণেই একটি স্পষ্ট হত্যাকাণ্ড আজ সাধারণ দুর্ঘটনার রূপ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
এই ঘটনা আমাদের সমাজের বিত্তশালী মা-বাবার চরম নৈতিক দেউলিয়াত্বকেও উন্মোচিত করেছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের হাতে লাইসেন্স ছাড়া বিলাসবহুল ঘাতক গাড়ি তুলে দেওয়া কেবল অদূরদর্শিতা নয়, এটি একটি সামাজিক অপরাধ। সন্তানকে সঠিক অনুশাসনের মধ্যে না রেখে ক্ষমতার দাপটে বেপরোয়া হতে উৎসাহিত করা এবং অপরাধের পর বিপুল অর্থের থলে নিয়ে আদালতে হাজির হয়ে ভুক্তভোগী পরিবারটিকে কিনে নেওয়ার ব্যবস্থা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নিজের সন্তানকে বাঁচাতে টাকা দিয়ে আপসনামা তৈরি করে মূলত তাদের ভবিষ্যতে আরও বড় অপরাধী হওয়ার লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে।
আদালতের সামনে যখন টাকার বিনিময়ে জামিনে আপত্তি না করার আপসনামা উপস্থাপন করা হয়, তখন আইনের শাসনের মৌলিক ভিত্তিটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। সড়ক পরিবহন আইন কিংবা দণ্ডবিধিতে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে মানুষ মারা যাওয়া রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য। সেখানে একটি অত্যন্ত দরিদ্র ও অসহায় পরিবারকে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো এবং তার ওপর ভিত্তি করে আসামির জামিন বা সংশোধনাগারের সুবিধা তৈরি হওয়া বিচারব্যবস্থার ওপর এক মস্ত বড় তামাশা। ৯ লাখ টাকায় যদি রাজপথের রক্ত মোছার এই রফাদফা সমাজে স্থায়ী রূপ নেয়, তবে তা সাধারণ মানুষের জন্য ভয়ানক বার্তা বয়ে আনবে, যেখানে ধনী ও গরিবের মধ্যে এক অমানবিক বৈষম্য তৈরি হবে।
বিচারিক ব্যবস্থার মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে সিসিটিভি ফুটেজ সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করে চালকের আসনে থাকা লাইসেন্সহীন কিশোর, তাকে গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামতে দেওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন অভিভাবক এবং তথ্য গোপনের চেষ্টা করা চালক—সবার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করা জরুরি। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে, এ দেশের মাটিতে সাধারণ মানুষের রক্তের দাম কোনো ধনকুবেরের ৯ লাখ টাকার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।





