রাজধানী ঢাকায় ধারাবাহিক ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশের দাবি, এসব নাশকতার নেপথ্য নির্দেশনা ও অর্থের উৎস রয়েছে দেশের বাইরে। সম্প্রতি যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের চার সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এই ‘বিদেশি কানেকশন’-এর বিষয়টি সামনে আসে। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে চারটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে।
ডিবি পুলিশের তথ্যমতে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন রায়হান উদ্দিন, রাসেল খান, আলাউদ্দিন ও আব্দুল্লাহ। এর মধ্যে রায়হান বংশাল থানার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর ইউনিটের দপ্তর সম্পাদক ছিলেন। তিনি এর আগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় পাঁচ মাস কারাগারে ছিলেন এবং জামিনে বের হয়ে আবারও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ান। ডিবির ওয়ারী বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোল্লা মো. শাহীন জানান, গ্রেপ্তার রায়হানের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করে বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে ককটেল বিস্ফোরণের সঙ্গে এই যোগাযোগের সরাসরি সম্পর্ক ঠিক কী ধরনের, তা এখনও তদন্তাধীন।
ঢাকায় একের পর এক নাশকতার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শহরের বিভিন্ন প্রান্তে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে এসব বিস্ফোরণ ঘটানো হচ্ছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ককটেল বিস্ফোরণের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে রায়হানকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লালবাগের জেএন সাহা রোডের একটি বাসার পার্কিংয়ে ইটের খোয়ার বস্তা থেকে চারটি ককটেল উদ্ধার করা হয়, যা ডিএমপির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট নিষ্ক্রিয় করে। এরপর ডেমরার ডগাইর এলাকায় অভিযান চালিয়ে বাকি তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে, রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার এবং ২৪৬টি পয়েন্টে পুলিশের তল্লাশি চৌকি বসানোর পরও ককটেল হামলা থামানো যাচ্ছে না। গত শনিবার ও রবিবারও ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। রবিবার দুপুরে হাইকোর্টের সামনে এবং এর কিছু সময় পর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের সড়কে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। এর আগের রাতে শাহবাগের তিন নেতার মাজারের পাশে এবং কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের একটি প্ল্যাটফর্মেও বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এছাড়া শনিবার সন্ধ্যায় ও রাতে মিরপুর, মধ্যবাড্ডা ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে এবং যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় ককটেল বিস্ফোরণে এক অটোরিকশাচালক আহত হন।
এর আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর মালিবাগ, আগারগাঁও, মহাখালী, যাত্রাবাড়ী, বাবুবাজার, মগবাজার ও বিটিভি ভবনের সামনেসহ রাজধানীর ১৪টি স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে কাফরুল থানার সামনে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেওয়া হয়। একের পর এক এসব ঘটনার পেছনে কোনো সমন্বিত নেটওয়ার্ক কাজ করছে কি না এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাছে কীভাবে নির্দেশনা ও অর্থ পৌঁছাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ ও গোয়েন্দাদের একাধিক দল।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, এসব ককটেল বিস্ফোরণের মূল উদ্দেশ্য তাৎক্ষণিক বড় কোনো প্রাণহানি ঘটানো নয়, বরং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। একাধিক এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে বিস্ফোরণ ঘটানোর ফলে রাজধানীর মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে দ্রুত হামলা চালিয়ে পালিয়ে যাওয়ার কৌশল ব্যবহার করছে হামলাকারীরা। বর্তমানে গোয়েন্দারা শুধু হামলাকারী শনাক্ত করতেই সীমাবদ্ধ নন; কে ককটেল তৈরি করছে, কোথায় মজুত করছে, কারা পরিবহন করছে এবং হামলার স্থান কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে তা জানার চেষ্টা করছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে ককটেল সরবরাহকারী, অর্থদাতা ও মূল পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে বের করা হবে বলে জানিয়েছে ডিবি।
তদন্তকারীদের সামনে এখন মূলত তিনটি বড় প্রশ্ন— ঢাকার মাঠপর্যায়ের নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত, বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের ধরন কী এবং সেই যোগাযোগের সঙ্গে নাশকতার প্রত্যক্ষ যোগসূত্র কতটা? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই বোঝা যাবে সাম্প্রতিক এই ককটেল বিস্ফোরণগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি এর পেছনে দেশ-বিদেশে বিস্তৃত কোনো সুনির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক কাজ করছে। আপাতত ডিবির তদন্তে উঠে আসা বিদেশি যোগাযোগের সূত্র ধরেই পরবর্তী তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।





