প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ৩২আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ৪৬। রাজধানী ঢাকা এখন ধারণক্ষমতার পাঁচগুণ বেশি মানুষের ভার বহন করছে। আয়তন ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা অনুযায়ী শহরটি ৭০ থেকে ৭৫ লাখ মানুষের জন্য উপযোগী হলেও বর্তমানে এখানে ৩ কোটি ৬৬ লাখের বেশি মানুষ বসবাস করছেন। প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজারের বেশি মানুষ নতুন করে এই শহরে থিতু হচ্ছেন, যার ফলে নাগরিক সেবা খাত প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একজনের সেবা পাঁচজনের মধ্যে ভাগ করে দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বের মেগা সিটিগুলোর মধ্যে জনসংখ্যা অনুপাতে ঢাকা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও বাসযোগ্যতার সূচকে এটি ১৭১তম। বর্তমানে কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ার ত্রিপোলি ও সিরিয়ার দামেস্কের চেয়ে ঢাকার অবস্থান কিছুটা ভালো। নগর পরিকল্পনাবিদদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি বজায় থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকা পুরোপুরি বাসযোগ্যতা হারাবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১৮ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার দুই শতাংশ। জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস ২০২৫’ প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে এ সংখ্যা ৩ কোটি ৬৬ লাখে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের আবাসন প্রোগ্রামের (ইউএন-হ্যাবিট্যাট) মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি বাসযোগ্য শহরের প্রতি একরে ৬০ থেকে সর্বোচ্চ ১২০ জন মানুষ বসবাস করতে পারে, কিন্তু ঢাকায় এখন প্রতি একরে গড়ে ৮০০ মানুষ গাদাগাদি করে থাকছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ১৩ গুণ বেশি।
নগরবিদ ও শিক্ষাবিদদের মতে, ঢাকামুখী জনস্রোতের মূল কারণ সরকারের সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অভাব, ঢাকাকেন্দ্রিক শিল্পকারখানা ও প্রশাসনের কেন্দ্রীভূত অবস্থান। কর্মসংস্থান, উন্নত চিকিৎসা, শিক্ষা ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের আশায় মানুষ গ্রাম থেকে ঢাকায় ছুটছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক জানান, প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার মানুষ ঢাকায় নতুন করে বসবাস শুরু করছেন।
পরিবেশবিদরা বলছেন, বিশ্বের ১৭৩টি শহরের ওপর ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) পরিচালিত জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় দ্বিতীয়বারের মতো ১৭১তম স্থানে রয়েছে ঢাকা। ইআইইউর চলতি বছরের গ্লোবাল লায়াবিলিটি ইনডেক্সে দেখা গেছে, স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামোসহ পরিষেবার দিক থেকে ঢাকার মোট স্কোর ৪২। ঢাকার নিচে রয়েছে শুধু ত্রিপোলি ও দামেস্ক। তালিকায় ত্রিপোলির অবস্থান ১৭২তম এবং দামেস্ক রয়েছে সর্বশেষ ১৭৩তম স্থানে।
রাজউক ও সিটি করপোরেশন কর্মকর্তারা জানান, ঢাকার রাস্তা ও ফুটপাত অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠায় বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকার পার্থক্য মুছে গেছে। বর্তমান সক্ষমতা দিয়ে বড়জোর ৮০ লাখ থেকে এক কোটি মানুষকে সেবা দেওয়া সম্ভব, কিন্তু সেবা নিতে হচ্ছে ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষকে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত মানুষ বসবাস করায় নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। বুয়েটের অধ্যাপক ড. মু. মুসলেহ উদ্দিন হাসান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম এ সমস্যা সমাধানে দ্রুত প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, জনশক্তি নীতিমালা ও গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছেন। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ ঢাকা ৫ কোটি ২১ লাখ জনসংখ্যা নিয়ে বিশ্বের এক নম্বর মেগাসিটিতে পরিণত হতে পারে।





