কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ব্যবহারে পিছিয়ে বাংলাদেশ, সতর্ক করল বিশ্বব্যাংক

Published: November 3, 2026, 5:59 am

অনুকূল বয়সকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুত বৃদ্ধির যে সুযোগ বাংলাদেশের সামনে রয়েছে, তা দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। ২০৪৫ সালে দেশের জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সময়সীমা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাবে। তবে প্রয়োজনীয় ও মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দেশ অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে প্রবীণ জনসংখ্যার অনুপাতে তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবাও পর্যাপ্ত নয়। এ অবস্থা বজায় থাকলে দেশের বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা অর্থবহ সুফল না এনে উল্টো অর্থনৈতিক চাপে রূপ নিতে পারে। বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এমন আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করা হয়েছে।

মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংক ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জনসংখ্যার বয়সকাঠামোর সাম্প্রতিক পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশের হাতে বর্তমানে প্রায় দুই দশক সময় রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য প্রতিবেশীদের তুলনায় বাংলাদেশ সংস্কারের জন্য কিছুটা বেশি সময় পেলেও কাঠামোগত দুর্বলতা কাটাতে এখনই কার্যকর ও স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বানুমান অনুযায়ী, আগামী এক দশকের কম সময়ের মধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর পর কমতে শুরু করবে। ২০৪৯ সালের মধ্যে সমগ্র অঞ্চলটি একটি বার্ধক্যপ্রবণ অর্থনীতিতে পরিণত হবে, যখন মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বয়স হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ২০৫১ সালের মধ্যে দেশটি প্রবীণ জনগোষ্ঠীপ্রধান রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হবে।

প্রতিবেদনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মক্ষম বয়সী মানুষের সংখ্যা বাড়ার ফলে অঞ্চলের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রতিবছর গড়ে ০.৪ শতাংশ অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি যুক্ত হয়ে আসছিল। একই সঙ্গে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বছরে বেড়েছিল ১.১ শতাংশ। তবে জনসংখ্যার বয়সকাঠামো থেকে আসা এই বাড়তি সুবিধা চিরস্থায়ী হবে না। ২০০০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে আঞ্চলিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে জনসংখ্যার এ বার্ষিক অবদান কমে মাত্র ০.১ শতাংশে নেমে আসবে।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট এ বিষয়ে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলো প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত গতিতে বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি এবং তরুণ তরুণীদের পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। এর পাশাপাশি বয়স্ক জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে আগাম প্রস্তুতি জরুরি। এতে একদিকে যেমন কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সুফল পাওয়া সম্ভব হবে, অন্যদিকে সুস্থ প্রবীণদের অর্থনীতির মূলধারায় রেখে দ্বিতীয় দফায় জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের বড় ঘাটতিকে অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বৈশ্বিক সংস্থাটি। প্রতিবেদনটি বলছে, জনসংখ্যার অনুকূল অনুপাত থাকলেও উপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। দেশে সীমিত পরিসরে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রমবাজারে নারীদের নিম্ন অংশগ্রহণ এবং দক্ষ মানবসম্পদের অভাব দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি আটকে রাখছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৮৪ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষ, যা সংখ্যায় প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজের ওপর নির্ভরশীল। এমনকি উচ্চশিক্ষিত যুবসমাজও প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন; বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারীদের ৪৪ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতেই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি যেমন ধীর, তেমনি সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী ছাঁটাইয়ের পথ বেছে নিয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর জিন পেসমে মন্তব্য করেন, বাংলাদেশের জনমিতিক সুযোগগুলো কতটা অর্থনৈতিক সুফলে রূপ নেবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে বর্তমান সময়ে গৃহীত পদক্ষেপের ওপর। প্রাতিষ্ঠানিক খাত যেন মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে সে জন্য সহায়তার পাশাপাশি যুবসমাজকে আধুনিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং নারীদের কাজের পরিবেশ সহজ করতে হবে। একই সঙ্গে বয়স্কদের সামাজিক সুরক্ষা ও অবসরের পর আয় নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী জোরদারের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার চরম পিছিয়ে থাকার চিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আয়ু বাড়লেও প্রবীণদের সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবনের নিশ্চয়তা নেই। এ অঞ্চলে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ১৭ শতাংশ কোনো পেনশনে অবদান রাখেন এবং বয়স্কদের মাত্র ১০ শতাংশ পেনশন সুবিধা উপভোগ করেন, যা বিশ্বে সর্বনিম্ন কভারেজের অন্যতম।

এই অর্থনৈতিক ঝুঁকি সামলাতে বিশ্বব্যাংক জোড়া নীতি গ্রহণের জোর তাগিদ দিয়েছে। প্রথমত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, ব্যবসার নিয়মকানুন সহজীকরণ, গুণগত শিক্ষাব্যবস্থা ও দক্ষতার উন্নয়ন ঘটিয়ে তরুণ ও নারী জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বয়স্কদের উন্নত চিকিৎসা সেবা, সেবা-পরিচর্যা ও টেকসই পেনশন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এতে বয়স্কদের জীবনের মান ও আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে।

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১১: ৩৭আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১১: ৪৯

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh