‘ময়না’ ডাকলেই উড়ে আসে শালিকজোড়া, বলছে মা-বাবা ও কুটুম শব্দ

Published: October 3, 2026, 5:50 am

বাড়ির উঠানে অপরিচিত কেউ পা রাখলেই হঠাৎ উড়ে এসে বসছে দুটি শালিক পাখি। এরপরই ডেকে উঠছে ‘কুটুম, কুটুম’ শব্দে। বাড়ির লোকজনের সাড়া না পেলে আবার ডাকছে ‘সাদিক’, ‘মা’ কিংবা ‘বাবা’ বলে। ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার বিরহলি গ্রামের আবদুস সোবহানের বাড়িতে নিয়মিতই দেখা মিলছে এমন অদ্ভুত ও মনোরম দৃশ্যের। খাঁচায় বন্দী না রেখে সম্পূর্ণ মুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই শালিক দুটির নাম পরিবারের সদস্যরা আদর করে রেখেছেন ‘ময়না’। মানুষের সঙ্গে থাকতে থাকতে পাখি দুটি এখন বেশ কিছু শব্দ বলতে শিখেছে।

এই গল্পটির শুরু প্রায় পাঁচ বছর আগে। আবদুস সোবহানের ছেলে সাদিকুল ইসলাম প্রতিবেশী হরিপুর উপজেলা থেকে দুটি শালিকের ছানা নিয়ে এসেছিলেন। পাখি দুটিকে খাঁচায় আটকে না রেখে বাড়ির উন্মুক্ত পরিবেশেই লালন-পালন শুরু করেন তিনি। নিয়মিত খাবার, নিরাপদ আশ্রয় আর মানুষের সান্নিধ্যে ধীরে ধীরে বাড়ির পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে শালিক দুটি। বয়স যখন প্রায় দুই বছর, তখন থেকেই পরিবারের সদস্যদের মুখে শোনা বিভিন্ন শব্দ অনুকরণ করতে শুরু করে তারা।

এখন পাখি দুটি বাড়ির উঠান, সামনের দোকান কিংবা গাছের ডালে মুক্তভাবে উড়ে বেড়ায়। অনেক দূরে উড়ে গেলেও কিছুক্ষণ পর আবার ঠিকই ফিরে আসে এই বাড়িতে। খাবারের সময় হলে বাড়ির আশপাশে ঘুরঘুর করতে থাকে। অপরিচিত কেউ এলে ‘কুটুম, কুটুম’ ডাক দিয়ে তারা বাড়ির লোকদের নতুন অতিথির আগমনবার্তা জানিয়ে দেয়।

সাদিকুলের মা সিদ্দিকা বেগম ‘ময়না, ময়না’ বলে ডাকতেই মুহূর্তের মধ্যে উড়ে এসে কাছে বসে শালিক দুটি। তাঁর মুখে শোনা শব্দের অনুকরণে একে একে বলতে থাকে ‘সাদিক’, ‘মা’, ‘বাবা’, ‘ভাই’, ‘ভাবি’ ও ‘আল্লাহ’ শব্দগুলো। এমনকি কিছুক্ষণ পর পর তারা মুরগির ডাকও হুবহু অনুকরণ করে দেখায়। উঠানে পলিথিন বিছিয়ে পানি ঢেলে দিলে শালিক দুটি সেখানে ডানা ভিজিয়ে গোসল করে নেয়, তারপর রোদে বসে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে আবার নানা শব্দ করতে শুরু করে। সিদ্দিকা বেগম বলেন, ‘লালন-পালন করতে করতে পাখিগুলোর প্রতি মায়া জমে গেছে। ওরাও আমাদের ছেড়ে কোথাও যায় না।’ বাড়ির কর্তা আবদুস সোবহানও জানান, নিজের সন্তানের মতোই পরম স্নেহে তারা শালিকজোড়াকে বড় করেছেন।

বিকেলের দিকে কাজ শেষে যখন সাদিকুল ইসলাম বাড়ি ফেরেন, তখন তাঁকে দেখে শালিক দুটি ‘সাদি…কুল’, ‘সাদি…কুল’ বলে ডাকতে শুরু করে। সাদিকুল জানান, পাখি দুটির জন্য বাড়িতে আলাদা বাসা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। খাবারের সময় ছাড়া তারা আশপাশেই ঘুরে বেড়ায়। বাড়ির সামনের রবিউল ইসলামের চা-পিঁয়াজুর দোকানেও শালিক দুটির নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। দোকানের ক্রেতারা তাদের খাবার দেন এবং গ্রামের মানুষও তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন।

চা দোকানদার রবিউল ইসলাম জানান, শালিক দুটি এখন শুধু ওই পরিবারের নয়, বরং পুরো এলাকার মানুষের কাছে এক বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই কথা বলা পাখি দেখতে আসে। অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করে পাখি দুটি কিনতে চান। তবে সাদিকুল ইসলামের সাফ কথা, ‘এত সাধের পাখি কি বিক্রি করা যায়!’

পাখির এই আচরণের বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক শিক্ষক মাজেদ জাহাঙ্গীর জানান, শালিক পাখি যদি কোনো স্থানে পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পায়, তবে তারা সেই পরিবেশের সঙ্গে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। সাদিকুলের বাড়িটি শালিক দুটির কাছে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠায় তারা বারবার সেখানেই ফিরে আসে। মানুষের কাছাকাছি থাকার কারণে তারা এই শব্দগুলো অনুকরণ করতে পেরেছে।

পীরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, পাখির গলায় মানুষের স্বরযন্ত্রের মতো ‘সিরিংক্স’ নামের একটি বিশেষ অঙ্গ থাকে, যার সাহায্যে তারা বিভিন্ন সুর ও শব্দ তৈরি করতে পারে। শালিক পাখি মানুষের কথা ও চারপাশের শব্দ মনে রেখে তা অনুকরণ করতে সক্ষম। তবে তারা মানুষের মতো শব্দের অর্থ বুঝে কথা বলে না, কেবল শোনা শব্দের পুনরাবৃত্তি করে মাত্র।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo