রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের হোপ মার্কেট এলাকা এখন সম্পূর্ণ ফাঁকা। গত বুধবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উচ্ছেদ অভিযানের পর সেখানকার সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত হয়েছে। গত শুক্রবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে শুরু করে মিরপুর ১৩ নম্বর সেকশন পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার এলাকার ফুটপাতে কোনো হকার বা ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা নেই। মাথার ওপর ঝুলতে থাকা ত্রিপল বা পলিথিনের ছাউনি এবং কাঠ-বাঁশের কাঠামোও এখন উধাও। পথচারীরা কোনো বাধা ছাড়াই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করছেন।
গত শুক্রবার বেলা তিনটার দিকে শেওড়াপাড়ার একটি ছাত্রীনিবাস থেকে মিরপুর ১০-এর পানির ট্যাংক এলাকায় কাপড় কিনতে আসেন দুই শিক্ষার্থী সুরাইয়া মিম ও নওশীন জাহান। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থেকে নেমে চারপাশ ফাঁকা দেখে তাঁরা কিছুটা বিভ্রান্তিতে পড়েন। গত বুধবারের উচ্ছেদ অভিযানের খবর তাঁদের জানা ছিল না। পরিচিত জায়গায় এসে কোনো দোকানপাট না দেখে অবাক হলেও ফুটপাতের এই সুন্দর ও খোলামেলা রূপ দেখে তাঁরা খুশি হন। সুরাইয়া মিম বলেন, আগে বোঝার উপায়ই ছিল না যে এই রাস্তাটি এত প্রশস্ত এবং পাশে হাঁটার জন্য ফুটপাত রয়েছে। নওশীন জাহান মন্তব্য করেন, ফুটপাত ও সড়কজুড়ে হকারদের দখলের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের কতটা ভোগান্তি পোহাতে হতো, তা এখনকার ফাঁকা অবস্থা দেখলেই বোঝা যায়।
এলাকার হোপ প্লাজা নামের একটি ভবনের চারপাশের সড়ক ও ফুটপাতে গড়ে ওঠা ভাসমান বাজারটি স্থানীয়ভাবে ‘হোপ মার্কেট’ নামে পরিচিত ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সি ব্লকের অ্যাভিনিউ-২ থেকে ৬ নম্বর লেন পর্যন্ত প্রায় ২০০ মিটার সড়কের দুই পাশের ফুটপাতই হকারদের দখলে ছিল। অভিযানের আগে মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ১১/১ ও ১১/২ নম্বর লেন, বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদের পাশের ফুটপাত, মিরপুর আদর্শ বালিকা উচ্চবিদ্যালয় এবং সি ব্লকের অ্যাভিনিউ-২-এর সড়ক ও ফুটপাতের বড় অংশ হকাররা দখল করে রেখেছিল। দেয়ালের সঙ্গে বাঁশ-কাঠ বেঁধে পলিথিন ও ত্রিপল টাঙিয়ে এবং মূল সড়কের ভেতরেও দুই-তিন সারিতে অস্থায়ী দোকান বসানো হয়েছিল। এসব দোকানে মূলত নারী ও শিশুদের পোশাক, জুতা, কসমেটিকস, অলংকার এবং ফুচকা, চটপটি ও ভাজাপোড়ার দোকান ছিল। শুক্রবার সেখানে কোনো দোকান দেখা যায়নি, তবে বুধবার ভেঙে দেওয়া দোকানের বাঁশ, কাঠ ও ত্রিপলের কিছু অংশ পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
উচ্ছেদের পর স্বস্তি ফিরেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনে। চার বছরের ছেলে আফসারকে নিয়ে নির্বিঘ্নে ফুটপাত দিয়ে হাঁটছিলেন ফরিদা বেগম, যিনি গত দুই বছর ধরে ৬ নম্বর লেনের একটি বাসায় থাকেন। তিনি বলেন, আগে বিশেষ করে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়ে এই রাস্তা ও ফুটপাত দিয়ে হাঁটার কোনো উপায় ছিল না। এখন কোনো ঝামেলা ছাড়াই হাঁটতে পারছেন এবং তাঁর ছেলেও নিজে নিজে হাঁটছে। বি ব্লকের ১১/২ নম্বর লেনের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, আগে তাঁরা চরম যন্ত্রণার মধ্যে ছিলেন। এখন বাসা থেকে বের হয়ে শান্তি লাগছে। সিটি করপোরেশন যেন নিয়মিত নজরদারি রাখে যাতে আবারও এই ফুটপাত ও সড়ক অবৈধ দখলদারদের কবলে না পড়ে, সেই প্রত্যাশা জানান তিনি।
উল্লেখ্য, গত বুধবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে হোপ মার্কেটের দিকে ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান শুরু করে ডিএনসিসি। অভিযান চলাকালে হকার ও দোকানিদের সঙ্গে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় ডিএনসিসির তিনটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয় এবং পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। হামলার শিকার হন গণমাধ্যমকর্মীরাও। এ ঘটনায় পুলিশ ৩০ জনকে আটক করেছে। পরে দুপুরের দিকে ঘটনাস্থলে যান ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তাঁর উপস্থিতিতে মিরপুর ১০ থেকে মিরপুর ১৩ নম্বর পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের ফুটপাতের সব ভাসমান দোকান উচ্ছেদ করা হয়।





