দেশের একমাত্র প্রবাল সমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে পর্যটক যাতায়াত ও রাতযাপনের সময়সীমা একলাফে অনেকটাই বাড়িয়েছে সরকার। আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার পর্যটকের সীমা নির্ধারিত ছিল, তা বাড়িয়ে এখন সাড়ে তিন হাজার করা হয়েছে। একই সঙ্গে দ্বীপে পর্যটকদের রাতযাপনের সুযোগ দুই মাসের পরিবর্তে বাড়িয়ে করা হয়েছে সাড়ে চার মাস। তবে দ্বীপের সুপেয় পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সংবেদনশীল পরিবেশ এই অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে পারবে কি না, তা নিয়ে কোনো হালনাগাদ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জারি করা নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্ট মার্টিনে পর্যটকেরা ভ্রমণ ও রাতযাপন করতে পারবেন। ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রতি পর্যটককে ১০০ টাকা করে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। এর আগে শুধুমাত্র ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে রাতযাপনের অনুমতি ছিল। রাতযাপন নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর করতেই গত মঙ্গলবার মন্ত্রণালয় থেকে নতুন এই নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, জাহাজমালিক ও হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন অন্তত ছয় হাজার পর্যটক যাতায়াতের সুযোগ চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে তা কমিয়ে সাড়ে তিন হাজার নির্ধারণ করা হয়।
দৈনিক ৭৫ শতাংশ পর্যটক বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক বলে মনে করছেন পরিবেশ আন্দোলনকারীরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন জানান, পরিবেশগত বহনক্ষমতা বিচারে সেন্ট মার্টিনে দিনে সর্বোচ্চ ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ পর্যটক যাওয়া যুক্তিযুক্ত। কিন্তু দ্বীপের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সুপেয় পানির সক্ষমতা না বাড়িয়েই সংখ্যাটি সাড়ে তিন হাজারে উন্নীত করা হয়েছে। কক্সবাজারের মতো গণপর্যটন সেন্ট মার্টিনে সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, পর্যটন ব্যবসায়ীদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে পরিবেশকে ঝুঁকিতে ফেলা অনুচিত।
একই মতামত ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, অতীতে পরিবেশ অধিদপ্তর ও সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতো কারিগরি সংস্থার মতামতের ভিত্তিতে পর্যটকের সীমা ঠিক করা হতো। এবার রিসোর্ট মালিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অনুরোধে সীমা বাড়ানো হয়েছে। যেখানে আগের দুই হাজার পর্যটকের সীমা কার্যকর করতেই প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হতো, সেখানে সাড়ে তিন হাজার পর্যটকের ওপর নজরদারি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি। পাশাপাশি পর্যটকদের কাছ থেকে সংগৃহীত ১০০ টাকা ফি কোথায় ব্যয় করা হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট ব্যাখ্যার দাবি জানান তিনি।
১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। সৈকতে রাতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দে গান বাজানো, বারবিকিউ করা এবং কেয়াবন বা জীববৈচিত্র্যের ক্ষতিসাধন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একসময় এই দ্বীপে প্রবাল, সামুদ্রিক কাছিম, শৈবাল, শামুক-ঝিনুক ও পরিযায়ী পাখিসহ ১ হাজার ৭৬ প্রজাতির জীববৈচিত্র্যের আবাস ছিল। তবে গত দুই দশকে প্লাস্টিক দূষণ ও অবৈধ অবকাঠামো নির্মাণের কারণে অনেক প্রজাতি ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পরিবেশ ছাড়পত্র ও অগ্নিনিরাপত্তা অনুমোদন ছাড়াই যত্রতত্র হোটেল-রিসোর্ট গড়ে ওঠে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার সেন্ট মার্টিনে পর্যটন নিয়ন্ত্রণের বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রতিদিন দুই হাজার পর্যটকের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। এর ফলে গত দুই মৌসুমে ২ লাখ ৩৭ হাজার পর্যটক ভ্রমণ করেন, যা তিন বছর আগের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। পর্যটক কমায় সৈকত ও সমুদ্রে প্লাস্টিক ফেলা কমে আসে এবং সামুদ্রিক পরিবেশের উন্নতি ঘটতে দেখা যায়। গবেষণাপত্র 'জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্যুরিজম'-এ ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটন বন্ধ থাকার সময় সাগরে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।
পর্যটন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এর অধীনে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং পর্যটননির্ভর নির্দিষ্ট পরিবারের জন্য দুই মাসের আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা ছিল। এছাড়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে প্রকৃতিবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করতে একটি মহাপরিকল্পনার খসড়াও চূড়ান্ত করা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, নতুন করে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো হলে এই পরিবেশগত সুফল ধরে রাখা সম্ভব হবে না এবং অতিরিক্ত প্লাস্টিক ও পয়োবর্জ্যের দূষণ সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়বে।
পর্যটক বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর ব্যস্ততার কারণে বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেনের কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা খানম দেশের বাইরে থাকায় হোয়াটসঅ্যাপ ও লিখিত বার্তার মাধ্যমে চেষ্টা করেও তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।





