মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়া ও অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতার মূল্যায়নে একটি স্থায়ী কর্মপদ্ধতি তৈরি করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যাতে এসব শিক্ষার্থীর দক্ষতা বাড়িয়ে উপযুক্ত কর্মসংস্থান ও ক্যারিয়ারের সুযোগ করে দেওয়া যায়। শনিবার দুপুরে রাজধানী আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘চ্যালেঞ্জড স্টুডেন্টস কনভেনশন ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা জানান প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন।
গণস্বাক্ষরতা অভিযান এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে আয়োজিত এই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। সরকার নিজ উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও যোগ্যতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে। শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সচিবদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যে স্থায়ী কর্মপরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে, তার আওতায় কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় আগ্রহীদের স্থানীয় টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি যেসব শিক্ষার্থীর ভালো ব্যবসার ধারণা রয়েছে, তাদের জন্য ছোট পরিসরে প্রাথমিক তহবিলের সংস্থান করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ ও সম্ভাবনা তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, সরকার জাপানি, কোরিয়ান, চীনা বা ইউরোপীয় ভাষা শিক্ষার মতো স্বল্পমেয়াদি (তিন থেকে ছয় মাস) কোর্সের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এসএসসি ও এইচএসসির পর উচ্চশিক্ষা শেষ করেও যেখানে শতভাগ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা থাকে না, সেখানে ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণরা দ্রুত আত্মনির্ভরশীল হতে পারবে।
পরীক্ষায় কোনো বিষয়ে অকৃতকার্য হলে শিক্ষার্থীদের এক বছর অপেক্ষা না করিয়ে তিন মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। শিক্ষক ও অভিভাবকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার আশ্বাস দেন উপদেষ্টা। তিনি মনে করেন, সরকার গঠনের চার মাসের মধ্যে যদি পূর্ণাঙ্গ খাতা পুনঃনিরীক্ষণের মতো বড় সংস্কার আনা সম্ভব হয়, তবে আট মাস বয়সী সরকারের পক্ষে তিন মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার ব্যবস্থা করাও সম্ভব হতে পারে।
মাহ্দী আমিন তুলে ধরেন, এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত ফলাফল পায়নি। এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ভাগ্যের পরিবর্তন ছাড়া দেশের সার্বিক উন্নয়ন অর্থবহ হতে পারে না। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মতো কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতিও রাষ্ট্রের সমান দায়বদ্ধতা রয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন, ফলাফল খারাপ হওয়ার পেছনে শুধু মেধার অভাব থাকে না; পারিবারিক ও আর্থিক সমস্যা, শিক্ষক বা ক্লাসরুমের সংকট, কিংবা পরীক্ষার আগে অসুস্থতার মতো বহুমাত্রিক কারণ থাকতে পারে। সরকার এসব সংকট দূরীকরণে শিক্ষকের ঘাটতি পূরণ, অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্যে উপদেষ্টা বলেন, জীবনে সাময়িক হোঁচট খাওয়া অস্বাভাবিক নয়। এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই যেমন ভবিষ্যতে সফল হওয়ার শতভাগ নিশ্চয়তা তৈরি হয় না, তেমনি খারাপ ফল জীবনের চূড়ান্ত ব্যর্থতা নির্দেশ করে না। বিশ্বজুড়ে অনেক সফল উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী, শিল্পী বা অ্যাথলেটের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা ফল খুব অসাধারণ ছিল না। তাই কেবল একটি সার্টিফিকেটের ওপর ভরসা না রেখে নিজের মেধা ও সৃজনশীলতার ওপর আস্থা রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির কাউন্সিলের চেয়ারপারসন ড. ইরাম মরিয়ম, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস এবং ডা. আরিফুর রহমান। বক্তারা শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।





