স্বৈরাচারের পতনের পরও দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর দ্বিতীয় দিনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাবিষয়ক নির্ধারিত বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।
১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র ধর্মঘটের স্মৃতিচারণ করে মতিউর রহমান বলেন, ‘সেই বিক্ষোভে আমি নিজেও অংশ নিয়েছিলাম। এরপর বহু আন্দোলনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলালেও মূল বিষয়গুলো একই জায়গায় থেমে আছে। দুঃখ হলো সে দাবিতে এখনো আমাদের কথা বলতে হয়।’ তিনি উল্লেখ করেন, ৬৪ বছর পরও তাকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য দাবি জানাতে হচ্ছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসকের পতনকে একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা হিসেবে অভিহিত করলেও প্রায় ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্যোগগুলো ধীরগতির এবং কিছু কমিশনের প্রস্তাব আলোর মুখ দেখেনি। শেখ হাসিনার শাসনামলে স্বাধীন সাংবাদিকতার সুযোগ সংকুচিত ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, সেই সময় নানা চাপ ও ভয়ের মুখে অনেক গণমাধ্যমের মালিকানা বদল হয়েছে, অনেক সাংবাদিককে কাজ ছাড়তে হয়েছে।
প্রথম আলোর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, দীর্ঘ সময় ধরে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপ ও হুমকির মুখে কাজ করতে হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলো অফিসের সামনে টানা সাত দিন সমাবেশ এবং ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি এবং দায়িত্বশীলরা কঠোর নির্দেশ দেননি। এছাড়া শেখ হাসিনার নির্দেশে বিভিন্ন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা বিজ্ঞাপন বন্ধসহ মালিকানা পরিবর্তনের চাপ সৃষ্টি করেছিল এবং তার বিরুদ্ধে প্রায় ৮০টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এসব শেখ হাসিনার নির্দেশেই হয়েছিল। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি ভালো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রায় ১৯ বছর পর বিএনপি আবার ক্ষমতায় এসেছে।
বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মতিউর রহমান বলেন, ১৯৯১–’৯৬ ও ২০০১–’০৬ সালে বিএনপির দুই আমলে তিনি প্রথমে ভোরের কাগজ ও পরে প্রথম আলোর সম্পাদক ছিলেন। সরকারের কঠোর সমালোচনা করেও কোনো হয়রানির শিকার হতে হয়নি। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও ৩১ দফার ১১ নম্বর দফায় গণমাধ্যম কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার মাত্র সাত মাস পার করেছে। এখনই সংবাদপত্র ও সম্প্রচারমাধ্যমের জরুরি সংস্কার কাজ শুরু না করলে দেশ পিছিয়ে পড়বে। তিনি জানান, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে সম্পাদক ও পরিচালকদের মধ্যে ইতিবাচক ঐকমত্য থাকলেও সরকার তা বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমানেও কিছু গণমাধ্যমে অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপ ও পরিবর্তনের খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।





