বিশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী কথাসাহিত্যিক ফ্রানৎস কাফকা এবং তার সাহিত্যিক দর্শন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রখ্যাত মেক্সিকান লেখক কারলোস ফুয়েন্তেস বিখ্যাত ঔপন্যাসিক মিলান কুন্দেরার একটি প্রাসঙ্গিক বক্তব্যের স্মৃতিচারণ করেন। কুন্দেরার মতে, জার্মান ভাষায় না পড়লে কাফকার মূল সাহিত্যরস অনুধাবন করা কঠিন। তবে মিগেল সায়েন্সের অনুবাদ করা স্প্যানিশ সংকলন ‘ফ্রানৎস কাফকা, ওব্রাস কমপ্লেতাস’ সেই সীমাবদ্ধতাকে অনেকাংশে অতিক্রম করেছে। কাফকা এমন এক লেখক, যাকে বাদ দিয়ে বিশ শতক তথা আধুনিক সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার গভীরতা উপলব্ধি করা প্রায় অসম্ভব।
কাফকার কালজয়ী সৃষ্টি ‘দ্য ট্রায়াল’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র যোসেফ কে.-কে সাধারণত নির্দোষ ও ব্যবস্থার শিকার হিসেবে দেখা হলেও সমালোচক পিয়েত্রো চিতাতি এক ভিন্ন ব্যাখ্যা হাজির করেন। তার মতে, যোসেফ কে. নিজেও এক অর্থে অপরাধী। চিতাতির এই দৃষ্টিতে কাফকার ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন স্তর—বাবার সঙ্গে জটিল সম্পর্ক, ইহুদি পরিচয়, জন্মশহর প্রাগের মধ্যবিত্ত পেশাজীবী সমাজ এবং সেই শহরের মনস্তাত্ত্বিক বন্দিত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘দ্য মেটামরফোসিস’-এর গ্রেগর সামসাও মুক্ত এক পোকা হওয়ার চেয়ে বলি দেওয়া সন্তান হয়ে থাকতে চায়। তবে বাইবেলের ইসহাকের মতো তার বলিদানের মুহূর্তে কোনো ঐশ্বরিক বার্তা এসে তাকে রক্ষা করে না।
মেক্সিকান লেখক সেয়াস্তিয়েল আলাত্রিস্তের উপন্যাস ‘এল দানিও’ (দ্য ড্যামেজ)-এ কাফকার সঙ্গে তার মায়ের গভীর সম্পর্কের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে মা নিজের সংগীতের আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিয়েছিলেন ছেলের সাহিত্যিক প্রতিভার জন্য। চিতাতির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ক্ষমতার শিকার ব্যক্তি নিজের অজান্তেই এমন এক ভার্চুয়াল শক্তি বা ক্ষমতার মিথ তৈরি করে, যা বাস্তবে শাসককে ক্ষমতাশালী করে তোলে। অর্থাৎ সম্রাটকে তার অদৃশ্য পোশাক পরিয়ে দেওয়ার পেছনে শোষিত মানুষের কল্পনা ও বাধ্যতাই বড় ভূমিকা পালন করে।
চিলির দার্শনিক মার্তিন ওপেনহাইন মনে করেন, কাফকার উপন্যাসগুলোর মূল ভাববস্তু পূর্ণতা পায় তার ব্যক্তিগত ডায়েরির অন্তর্জাগতিক প্রতিধ্বনির মাধ্যমে। উপন্যাসের চরিত্রগুলো যুক্তির আশ্রয় নিতে গিয়েই প্রান্তিক হয়ে পড়ে এবং আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতর নিজেকে হারিয়ে ফেলে। কাফকার জগতে ব্যক্তি এক ধরনের পরজীবী, যে ক্ষমতার ব্যবস্থার কৌশল বুঝতে না পেরে তার স্বৈরাচারী ভিত্তিকে উন্মোচিত করে দেয়। ‘দ্য ট্রায়াল’ এবং ‘দ্য ক্যাসল’ উপন্যাসে ক্ষমতার কেন্দ্রের যে শূন্যতা দেখানো হয়েছে, তা আদতে একটি মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই ক্ষমতা দৃশ্যমান না হয়েও একটি অদৃশ্য সম্ভাবনা হিসেবে মানুষকে সারাক্ষণ আতঙ্কে রাখে।
১৯২৪ সালে কাফকার মৃত্যুর এক দশক পর তার এই নরকীয় কল্পকাহিনি গেস্টাপো ও এনকেভিডির মতো গোপন পুলিশের রাতে এসে হানা দেওয়ার বাস্তবতায় পরিণত হয়। ১৯৩৭ সালে প্রাগ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক আবহে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছিল, যা কাফকার উপন্যাসের দৃশ্যকে মনে করিয়ে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, মিনস্কে কমরেড কমিশার আই. ভি. কোভালেভ যে অফিসে দায়িত্ব নিতে গিয়েছিলেন, সেটি ছিল সম্পূর্ণ খালি, কারণ তার পূর্বসূরি ও কর্মীদের স্ট্যালিনের নির্দেশে হত্যা করা হয়েছিল। আবার স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় ‘ইজভেস্তিয়া’-র সংবাদদাতা মিখাইল কোলৎসভ মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার আগে বলেছিলেন, স্ট্যালিন তাকে বিশ্বাসঘাতক বললে তিনি মিথ্যা অভিযোগকেও সত্যি বলে বিশ্বাস করবেন।
তবে পলিটিক্যাল অ্যানালিস্ট না হয়েও কাফকা ক্ষমতার এই বিশ্বজনীন রূপ এঁকেছেন খুব ব্যক্তিগত পরিসরে—একটি ঘরে, একটি অফিসে কিংবা একটি বিছানায়। ফেলিক্স গুয়াতারি ও জিল দেল্যুজ তাঁদের ‘কাফকা: টুওয়ার্ড আ মাইনর লিটারেচার’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, গ্রেগর সামসা শুধু তার বাবার কাছ থেকেই পালাতে চায়নি, বরং অফিস, আমলাতন্ত্র ও ব্যবসা থেকেও মুক্তি চেয়েছিল। একুশ শতকে ক্ষমতা যখন আরও বেশি অদৃশ্য হয়ে উঠেছে, তখন শোষিত মানুষই যেন ক্ষমতার সবচেয়ে বড় সহযোগীতে পরিণত হয়েছে। এই সার্বিক বিশ্লেষণটি কারলোস ফুয়েন্তেসের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আই বিলিভ: অ্যান এ টু জি অব আ লাইফ’-এর ‘কাফকা’ অধ্যায় থেকে সংগৃহীত।
এদিকে কাফকার ব্যক্তিগত জীবন ও অনুভূতির গভীরতা অনুধাবনে ‘লেটার্স টু ফেলিস বাই ফ্রান্ৎস কাফকা’ থেকে তাঁর ধারাবাহিক চিঠি প্রকাশ করা হচ্ছে। ফেলিস বাউয়ারকে লেখা এক চিঠিতে কাফকা নিজের গভীর সংবেদনশীলতা, অসন্তোষ ও অস্থিরতার কথা ব্যক্ত করেছেন। ফেলিসের পাঠানো একটি চিঠি তিনি বিভিন্ন স্থানে অন্তত বিশবার পড়েছেন—টাইপরাইটারের সামনে, খদ্দেরের উপস্থিতিতে, রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে এবং ঘরে বসে। তিনি লিখেছেন, চরম ক্লান্তি সত্ত্বেও রাতে দুই ঘণ্টা বরফশীতল রাস্তায় হেঁটেছেন এবং স্বপ্নে প্রথমবারের মতো ফেলিসকে দুঃখজনক এক ঘটনার সঙ্গে দেখেছেন।
ঐ চিঠিতে কাফকা আরও জানান, মধ্যরাতের পর তার বোনের কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। তবে মামা হয়ে আনন্দ পাওয়ার বদলে তিনি বোনের স্বামীর প্রতি তীব্র ঈর্ষা অনুভব করেছিলেন, কারণ কাফকা নিশ্চিত ছিলেন যে তাঁর নিজের কখনো কোনো সন্তান হবে না। অন্য এক চিঠিতে গভীর মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণায় ভুগে কাফকা ফেলিসকে অনুরোধ করেছিলেন যেন তারা একে অপরকে আর চিঠি না লেখেন। তিনি নিজেকে একটি ‘ভূত’ হিসেবে বর্ণনা করে ফেলিসকে তাঁকে ভুলে যাওয়ার পরামর্শ দেন এবং চিঠি ফেরত চাইলে একটি খালি পোস্টকার্ড পাঠানোর সংকেত দেন।
তবে সম্পর্কের অনিশ্চয়তা কেটে যাওয়ার পর কাফকা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে লেখেন, মাকে দোকান যাওয়ার সময় কাঁদতে দেখে তিনি তাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন ও হাসিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি জানান, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পটভূমিতে ‘যে মানুষটি অদৃশ্য হয়ে গেল’ শিরোনামে একটি নতুন উপন্যাস নিয়ে তিনি কাজ করছেন। পনেরো বছর পর তিনি কোনো বড় কাজ করার মতো আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন এবং এর ছয়টি অধ্যায় প্রায় শেষের পথে। প্রাগের পারিবারিক জীবন সম্পর্কে তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর সবচেয়ে ছোট বোন (যার বয়স কুড়ির সামান্য বেশি) প্রাগে তাঁর সবচেয়ে ভালো বন্ধু, অথচ তাঁর বাবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল পরস্পরকে ‘ভদ্রতার সঙ্গে ঘৃণা করার’। বন্ধু ম্যাক্স ব্রডের সঙ্গে হাঁটার সময় একটি ঘোড়ার গাড়ির মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা ও মেজাজ হারানোর কথাও তিনি চিঠিতে প্রিয়তমা ফেলিসকে বিস্তারিত লিখেছিলেন।





