প্রস্পেরো কি শেক্সপিয়ারের আত্মপ্রতিকৃতি? ‘দ্য টেম্পেস্ট’ নাটকের রহস্য

Published: October 9, 2026, 4:26 pm

শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত নাটক ‘দ্য টেম্পেস্ট’-এর প্রস্পেরো চরিত্রটি কি আসলে নাট্যকারের নিজেরই এক প্রচ্ছন্ন আত্মপ্রতিকৃতি? এই প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্যপ্রেমী ও গবেষকদের ভাবিয়ে তুলেছে। নাটকে প্রস্পেরোর ‘শিল্প’ বা জাদু এবং নাট্যরচনার মধ্যে এক গভীর সাযুজ্য লক্ষ্য করা যায়। একজন জাদুকর যেভাবে মানুষ ও ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করে নিজের কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করেন, একজন নাট্যকারও ঠিক একইভাবে চরিত্র, সংলাপ ও দৃশ্যপট সাজিয়ে দর্শকের সামনে একটি নতুন জগৎ তৈরি করেন।

১৭৪০ সালে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের ‘কবিদের কোণে’ (পয়েটস কর্নার) শেক্সপিয়ারের একটি প্রায় জীবন-সমান ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, নাট্যকার এক স্তূপ বইয়ের ওপর কনুই রেখে দাঁড়িয়ে আছেন এবং তার আঙুল নির্দেশ করছে একটি পাণ্ডুলিপির দিকে। সেই পাণ্ডুলিপিতে লেখা রয়েছে ‘দ্য টেম্পেস্ট’ নাটকেরই একটি বিখ্যাত সংলাপের পরিবর্তিত রূপ— যেখানে বলা হয়েছে, মেঘছোঁয়া মিনার, জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ, গম্ভীর মন্দির এবং এই বিশাল পৃথিবী একদিন স্বপ্নের মতো মিলিয়ে যাবে, কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট থাকবে না। ভাস্কর্যের সঙ্গে এই পঙ্‌ক্তি জুড়ে দেওয়ার কারণ হলো নাটকটিতে জাদু ও থিয়েটারের মধ্যকার গভীর সম্পর্ককে নির্দেশ করা।

প্রস্পেরোর জাদু অনেক ক্ষেত্রেই মঞ্চের কলাকৌশল বা প্রযুক্তির মতো কাজ করে। যেমন, ক্যালিবান ও তার সঙ্গীদের ফাঁদে ফেলতে সাজানো ঝলমলে পোশাক মূলত এক ধরনের নাট্য-প্রপ। আবার এরিয়েল যখন হার্পির রূপ ধরে এসে ডানা ঝাপটায় এবং ভোজের খাবার অদৃশ্য করে দেয়, তখন তৎকালীন লোকজ বিনোদনের মতো কোনো ঘূর্ণনশীল টেবিল বা বিশেষ মঞ্চ-যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। প্রস্পেরো একজন নাট্যকারের মতোই চরিত্রদের বর্তমান ও অতীতকে নিয়ন্ত্রণ করেন। নিজের ভাইয়ের হাতে ক্ষমতাচ্যুতি, দ্বীপে নির্বাসন, গাছে এরিয়েলের বন্দিদশা কিংবা ক্যালিবানের মা সাইকোরাক্সের পরিচয়— এসব অতীত আমরা কেবল প্রস্পেরোর মুখ থেকেই জানতে পারি। চরিত্রদের বর্তমান আচরণকে অর্থপূর্ণ করতে একজন নাট্যকার যেভাবে তাদের অতীত নির্মাণ করেন, প্রস্পেরোও যেন তাই করেছেন।

নাটকের এক পর্যায়ে প্রস্পেরো বলেন, আমাদের সব আয়োজন শেষ হয়েছে এবং অভিনেতারা আত্মার মতো পাতলা বাতাসে মিলিয়ে গেছে। স্বপ্নের মতো এই অসার নির্মাণ, মেঘছোঁয়া মিনার, প্রাসাদ, মন্দির ও এই বিরাট পৃথিবীও একদিন শেষ হয়ে যাবে। আমরা সবাই স্বপ্ন দিয়ে তৈরি এবং আমাদের ছোট্ট জীবন ঘুমের মাঝেই শেষ হয়। এই বক্তব্যে জাদু ও থিয়েটারের মধ্যকার সীমানা মুছে যায়। মঞ্চের ক্ষণস্থায়ী নাটকের মতোই প্রস্পেরোর তৈরি দৃশ্যপটও মিলিয়ে যায়। তবে প্রস্পেরো শুধু নাট্যকার নন, তিনি একজন রেনেসাঁস যুগের পণ্ডিতও বটে। তার ক্ষমতার উৎস হলো তার বই। সেই যুগে বিজ্ঞান, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, জাদুবিদ্যা ও গুপ্তবিদ্যার মধ্যে আজকের মতো কঠিন কোনো বিভাজন ছিল না। যেমন রেনেসাঁস মনীষী জন ডি গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের পাশাপাশি আলকেমি ও আত্মার যোগাযোগের চর্চা করতেন।

প্রস্পেরোর ক্ষমতার ভিত্তি যে তার বই, তা ক্যালিবানও জানত। তাই সে প্রস্পেরোর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের সময় তার বইগুলো ধ্বংস করার তাগিদ দেয়; কারণ বই ছাড়া প্রস্পেরোর কোনো ক্ষমতা থাকবে না। প্রস্পেরো নিজেও মিরান্ডাকে বলেছিলেন যে, জ্ঞানের খোঁজে নিমগ্ন থাকায় তার লাইব্রেরিই ছিল তার কাছে এক বিশাল রাজ্য। তবে শেষ পর্যন্ত তাকে এই ক্ষমতা ত্যাগ করতে হয়। তিনি তার জাদুর দণ্ড ভেঙে ফেলেন এবং বই সমুদ্রের গভীরে ডুবিয়ে দেন। এই দৃশ্যটি ক্রিস্টোফার মার্লোর ‘ডক্টর ফস্টাস’ নাটকের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে ফস্টাস তার বই পুড়িয়ে ফেলার আকুতি জানিয়েছিলেন। ১৫৯৩ সালে মার্লোর অকালমৃত্যু না হলে ইংরেজি নাটকের ইতিহাস হয়তো অন্য রকম হতো।

তবে প্রস্পেরোকে সরাসরি শেক্সপিয়ারের আত্মপ্রতিকৃতি ভাবা ঠিক হবে না। যদিও ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের মূর্তিটি এই ধারণাকে উসকে দেয়, কিন্তু শেক্সপিয়ারের সময়ে লেখকদের নিজের জীবনের দীর্ঘ আত্মপ্রতিকৃতি নাটকে ফুটিয়ে তোলার তেমন কোনো নজির ছিল না। একজন ভালো নাট্যকারের মূল শক্তিই হলো নিজের পরিচয় ভুলে রাজা, ভিখারি, খুনি, প্রেমিক বা প্রতারকের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রবেশ করা। আধুনিক মঞ্চায়নগুলো প্রস্পেরোর চরিত্রের অন্ধকার ও নিয়ন্ত্রণপ্রবণ দিকটিও তুলে ধরেছে। তিনি কেবল প্রাজ্ঞ বৃদ্ধ নন, বরং কখনো কখনো আধিপত্য আসক্ত শাসক। শেক্সপিয়ারের ‘ওথেলো’র ইয়াগো কিংবা ‘মেজার ফর মেজার’ নাটকের ডিউকের মধ্যেও এমন নিয়ন্ত্রণপ্রবণ চরিত্র তৈরি করার ক্ষমতা দেখা যায়, যারা নৈতিকভাবে আদর্শ নন। তাই প্রস্পেরোকে কেবল শেক্সপিয়ারের মহিমান্বিত রূপ হিসেবে দেখলে তার চরিত্রের জটিলতা ও বিপজ্জনক দিকটি আড়ালে পড়ে যায়। ‘দ্য টেম্পেস্ট’ নাটকের আসল প্রশ্নটি হয়তো শেক্সপিয়ারের নিজের পরিচয় নিয়ে নয়, বরং অন্যের জীবনকে নিজের ইচ্ছামতো সাজানো মানুষের ক্ষমতার সীমা কোথায়— তা নিয়ে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin