দাবি না মানলে যেকোনো সময় এক দফার আন্দোলনের হুঁশিয়ারি জামায়াত আমিরের

Published: September 19, 2026, 4:07 pm

১১-দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চে অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সরকার যদি জনগণের দাবি মেনে না নেয়, তবে চলমান ৮ দফা আন্দোলন যেকোনো সময় এক দফায় রূপ নিতে পারে। শনিবার বগুড়ার শেরপুর, মাটিডালি ও গাইবান্ধার পলাশবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত পথসভায় তিনি এ কথা বলেন। বর্তমান সরকারের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশে কৃষকের সার নেই, পেটে ভাত নেই, যুবকদের কর্মসংস্থান নেই এবং ব্যাংকে টাকা নেই; অথচ একটি দল কেবল নিজেদের আখের গোছাতে ও ‘খাই খাই’ জিকিরে ব্যস্ত রয়েছে।

শনিবার সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে ১১-দলীয় ঐক্যের এই ঢাকা-রংপুর লংমার্চ শুরু হয়। সকাল পৌনে ১০টায় গাজীপুরের ভোগরা বাইপাসে এবং দুপুর ১২টায় টাঙ্গাইল শহর বাইপাসের নগর জলফৈ মোড়ে পথসভা করেন জোটের নেতারা। এরপর দুপুর ১২টায় সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার হাটিকুমরুল গোলচত্বর এবং বিকেল পৌনে চারটায় বগুড়ার শেরপুরের ধুনট রোড বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। শেরপুরের পথসভায় জামায়াত আমির বলেন, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় সাধারণ মানুষ আজ দিশাহারা। কৃষি ও আর্থিক খাত গভীর সংকটে পড়েছে এবং যুবসমাজ বেকারত্বের বোঝা বইছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ঐক্যবদ্ধ গণ-আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।

বিকেল পাঁচটার দিকে বগুড়া মহানগরের মাটিডালি মোড়ে আয়োজিত পথসভায় শফিকুর রহমান সরকারের উদ্দেশে প্রশ্ন তোলেন, ‘আমরা আমাদের জায়গায় আছি, আপনারা জায়গা পরিবর্তন করলেন কেন? জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করলেন কেন?’ তিনি বলেন, গত সাত মাসে সংসদে তিনটি অধিবেশন পার হলেও জুলাইয়ের শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত এই সরকার এখনো ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন করেনি। দেশের জ্বালানি সংকট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বর্তমান রাষ্ট্রপতির অতীতের আন্দোলন ও স্লোগানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতি যখন বিএনপির মাঠের নেতা ছিলেন, তখন তাঁর স্লোগান ছিল ‘গ্যাস দে বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছেড়ে দে’। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দেওয়া সেই একই স্লোগান এখন তাঁরাও দিচ্ছেন, কারণ সরকার গ্যাস ও বিদ্যুৎ দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

সন্ধ্যা সাতটার দিকে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী সদরের চৌমাথা মোড়ে আরেকটি পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। গাইবান্ধা জেলা জামায়াতের রাজনৈতিক সেক্রেটারি ও গাইবান্ধা-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এই সভায় জামায়াত আমির বলেন, দাবি মানা হলে লংমার্চ বা কর্মসূচির প্রয়োজন হবে না। কিন্তু দাবি না মানলে ৮ দফা থেকে ৯ বা ১০ দফা এবং শেষ পর্যন্ত তা এক দফায় পরিণত হবে। সরকার যাতে শুভবুদ্ধির পরিচয় দেয়, সেজন্য তারা সময় দিচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সয়ে, তব পাপ যেন তারে সমভাবে দহে’—তাঁরা এই পাপের ভাগী হতে চান না। এই পথসভায় আরও বক্তব্য দেন এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, লেবার পার্টির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান, এবি পার্টির সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান।

লংমার্চের বিভিন্ন পথসভায় বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। শেরপুর শহরের করতোয়া বাসস্ট্যান্ডের উত্তর পাশে এনসিপির পৃথক পথসভায় তিনি গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান। বগুড়ার সভায় তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির চিত্র তুলে ধরে বলেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের নিখোঁজ সন্তানকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এই সরকারের আমলে হাজারো শিশু নিখোঁজ হয়েছে, যাদের অনেকের খোঁজ এখনো মেলেনি। রাস্তাঘাটে মা-বোনদের নিরাপত্তা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন সাহেবের যদি ন্যূনতম লজ্জাবোধ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে, তবে তাঁর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছেড়ে দেওয়া উচিত।

ভোট চুরির অভিযোগ এনে নাহিদ ইসলাম বলেন, ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জনগণ যে রায় দিয়েছিল, তার মধ্যে একটি ভোট চুরি করে এই সরকার ক্ষমতা দখল করেছে। আর অন্য ভোটের ফলাফল অস্বীকার করতে তারা এখন সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করেছে। জীবন দিয়ে হলেও গণভোটের রায় বাংলার মাটিতে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দেন তিনি। সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল পথসভায় তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিএনপি সব ক্ষেত্রে দলীয়করণের মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসন কায়েম করছে। তবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সন্তানদের কেউ ভয় পায় না উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার নিশ্চিত করতে না পারলে এই সরকারও স্বৈরাচারী হয়ে উঠবে।

উল্লেখ্য, এটি ১১-দলীয় ঐক্যের দ্বিতীয় বড় লংমার্চ কর্মসূচি। এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। জোটের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামীতে খুলনা-যশোর-কুষ্টিয়া, সিলেট ও ঢাকায় অনুরূপ কর্মসূচি পালন করা হবে। লংমার্চের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সাংবিধানিক সংস্কার কাউন্সিল গঠন, জুলাই গণহত্যার বিচার, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সারের সংকট সমাধান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo