বইয়ের আলোয় ১২ বছর: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও বিকাশের যৌথ উদ্যোগ

Published: October 8, 2026, 4:46 pm

ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও স্ক্রিন-টাইমের এই যুগে নতুন প্রজন্ম যখন বইয়ের জগত থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে, তখন পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করতে চার দশকের বেশি সময় ধরে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। এই মহতী উদ্যোগে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে গত ১২ বছর ধরে পাশে রয়েছে দেশের শীর্ষ আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বিকাশ। সম্প্রতি রাজধানীর ঢাকায় এই বইপড়া কর্মসূচির এক যুগের সফল পথচলা উপলক্ষে একটি বিশেষ প্রীতি সম্মিলনের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এছাড়া ভিডিও বার্তার মাধ্যমে যুক্ত হন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিকাশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল কাদীর। অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত ছিলেন দেশের খ্যাতনামা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, উভয় প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন স্কুলের কয়েক শতাধিক শিক্ষার্থী। বই ও লাইব্রেরির আদলে সাজানো মঞ্চে শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল বইয়ের বিবর্তনের ভিন্নধর্মী উপস্থাপন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটকের অনুপ্রেরণায় ‘অমলের পৃথিবী’ নাটিকা পরিবেশনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা তাদের পড়া প্রিয় বইগুলোর নাম একটি বিশাল খাতায় লিপিবদ্ধ করে।

২০১৪ সাল থেকে টানা ১২ বছর ধরে চলা এই যৌথ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের প্রায় তিন হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠাগারে চার লাখেরও বেশি নতুন বই পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এর সুফল পেয়েছেন ৩২ লাখের বেশি তরুণ পাঠক। ১১ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশের কথা বিবেচনা করে সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন ও জ্ঞানভিত্তিক বইগুলো নির্বাচন করা হয়।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, কিশোর বয়সে মননশীলতার বিকাশ সবচেয়ে দ্রুত হয়। তিনি উল্লেখ করেন, এই ১২ বছরে বিকাশের সহায়তায় পাওয়া ৪ লাখ বই দেশের ৩২ লাখ ছেলেমেয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, বিকাশ যদি এই অর্থ অন্য কোনো ব্যবসায়িক খাতে বিনিয়োগ করত, তবে হয়তো বেশি লাভবান হতো, কিন্তু তারা শিক্ষায় বিনিয়োগ করে জাতিকে লাভবান করেছে। বিকাশের সিইও কামাল কাদীর বলেন, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে কাজ করার বিষয়টি তার ছোটবেলার লাইব্রেরিতে যাওয়ার সুপ্ত আকর্ষণের সঙ্গে যুক্ত। তিনি মনে করেন, সব কিছু লাভের দিকে না তাকিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কাজ করার সুযোগ গ্রহণ করাটা জরুরি ছিল।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বই পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি বা সামাজিক দায়বদ্ধতা এখন ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে, কিন্তু বিকাশের এই অবদান সেই ফ্যাশনের বাইরে গিয়ে একটি বড় কন্ট্রিবিউশন। তিনি আরও যোগ করেন, একটি বই একটি জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, আর চার লাখ বই অসংখ্য শিক্ষার্থীর চিন্তার দিগন্ত প্রসারিত করে।

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরাও তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানায়। বিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থী রিদ্বীন জানান, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লাইব্রেরি থেকে তারা এমন অনেক বই পায় যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। হলিক্রস স্কুলের এক শিক্ষার্থী জানায়, প্রতিদিন অন্তত এক পৃষ্ঠা বই পড়ার যে নিয়ম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র শিখিয়েছে, তা এখন তার জীবনে বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ কেবল শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার কর্মসূচি নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্তচিন্তা ও সৃজনশীলতায় বলীয়ান করার একটি নিরন্তর সংগ্রাম।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo