রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালের দেয়াল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ এবং এমনকি সুনির্দিষ্ট অফিস খুলে দত্তক দেয়ার নামে দেদার চলছে মানব শিশু কেনাবেচা। অসাধু কিছু চক্র সরাসরি কমিশনের মাধ্যমে পণ্যের মতো শিশু বিক্রি করছে। এই অনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে হাসপাতালের কর্মচারী ও নার্স থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশু দত্তক বা বেচাকেনা সংক্রান্ত বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজে প্রতিনিয়ত এমন লেনদেনের পোস্ট দেখা যায়। ‘বাচ্চা দত্তক নেয়া এবং দেয়ার গ্রুপ’ নামক একটি ফেসবুক পেজে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায়, সেখানে অনেকেই সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু বা কয়েক বছর বয়সী শিশু দত্তক নেয়ার জন্য পোস্ট করছেন। তেমনই একটি পোস্টে ‘ঐশ্বর্য চৌধুরী ওরিন’ নামে একজন তিন বছরের ছেলে শিশু হস্তান্তরের প্রস্তাব দেন। অন্য একটি আইডি ‘হ্যান্ডসাম ক্রোকোডাইল-৮৯৯’ থেকে আর্থিক চাহিদার বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে পোস্টকারী তাতে সম্মতি জানান এবং যোগাযোগের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর চান।
এই চক্রের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বেরিয়ে আসে শিশু বিক্রির দরদামের চাঞ্চল্যকর তথ্য। ‘তিন্নি চৌধুরী’ নামের এক আইডি থেকে ৩-৪ বছর বয়সী একটি ছেলে শিশুর ছবি পাঠিয়ে চার লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে দরকষাকষির মাধ্যমে সাড়ে তিন লাখ টাকায় রফা হয়। শিশু বিক্রির কারণ হিসেবে তিনি দাবি করেন, তার বোনের ডিভোর্স হয়ে গেছে এবং স্বামী সন্তান নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় বোন একাকী এই সন্তান লালন-পালন করতে পারছেন না। পুরো টাকাটাই বোনকে দেয়া হবে এবং তিনশ টাকার স্ট্যাম্পে সই করে শিশুটি হস্তান্তর করা হবে বলে তিনি জানান।
একইভাবে ‘আফরান চৌধুরী’ নামের এক আইডি থেকে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর ছবি দিয়ে দত্তক দেয়ার বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি জানান, হাসপাতালে এক দরিদ্র মায়ের যমজ সন্তান (একটি ছেলে ও একটি মেয়ে) হয়েছে, যাদের লালন-পালনের সামর্থ্য পরিবারের নেই। হাসপাতালের বিল ও অন্যান্য খরচ বাবদ সামান্য টাকা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে শিশু দুটিকে নেয়া যাবে বলে তিনি দাবি করেন। তবে দত্তক নেয়ার আইনি সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, তিনশ টাকার স্ট্যাম্পের মাধ্যমে আজীবনের জন্য শিশু লিখে দেয়া হবে এবং ভবিষ্যতে কেউ তাদের খোঁজ নিতে যাবে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, আজিমপুর মাতৃসদন, মাতুয়াইল মা ও শিশু হাসপাতাল এবং মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের দেয়ালে বিজ্ঞাপন দিয়ে এই চক্রগুলো গ্রাহক আকর্ষণ করে। ঢাকায় এমন বেশ কয়েকটি ব্রোকার হাউজ বা মধ্যস্থতাকারী অফিস গড়ে উঠেছে, যারা নিজস্ব ফরম্যাটের মাধ্যমে উভয়পক্ষের তথ্য লিপিবদ্ধ করে চুক্তি করায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্রোকার হাউজের মালিক জানান, তাদের নেটওয়ার্ক পুরো বাংলাদেশ ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী দেশেও বিস্তৃত। তারা গর্ভ ভাড়ার (সারোগেসি) কাজও করে থাকেন এবং সম্প্রতি কানাডা প্রবাসী এক ব্যক্তির কাছে একটি মেয়ে শিশু হস্তান্তর করেছেন। তার তথ্যমতে, বাজারে মেয়ে শিশুর চাহিদা বেশি হলেও ছেলে শিশুর দাম বেশি। একটি মেয়ে শিশু ২ থেকে ৩ লাখ টাকায় এবং ছেলে শিশু সর্বনিম্ন ৪ থেকে ৫ লাখ টাকায় বিক্রি হয়, যা চাহিদা অনুযায়ী ওঠানামা করে।
আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, অর্থের বিনিময়ে শিশু কেনাবেচা বা চিরতরে হস্তান্তর করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। হাসপাতাল বা অভিভাবকের হেফাজত থেকে শিশুকে অন্য কারো কাছে হস্তান্তর করা আইনত দণ্ডনীয়। ২০১৩ সালের শিশু আইনেও শিশুর প্রতি অবহেলা, নিষ্ঠুরতা ও শোষণের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। ফলে আদালতের বাইরে যেকোনো ধরনের স্ট্যাম্প বা দলিলের মাধ্যমে শিশু কেনাবেচা অবৈধ। এছাড়া ২০২৫ সালের ইউনিসেফের ‘স্টপিং দ্য ট্রাফিক’ প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, শিশু দত্তক দেয়ার নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন প্রতারণার বিষয়টি তাদের নজরদারিতে রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত শিশু বিক্রির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থানায় আসেনি। এরপরও পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।





