ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে নারাজ ডোনাল্ড ট্রাম্প

Published: October 9, 2026, 7:18 pm

ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বছর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক করা এবং কিউবার ওপর জ্বালানি অবরোধের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু ইয়েমেনের হুতিদের ক্ষেত্রে তার আচরণ আশ্চর্য রকম সংযত। এর কারণ সম্ভবত তিনি জানেন যে, হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ, শেষ করা ততটা নয়। সৌদি আরব তাদের বিরুদ্ধে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়া হুতিদের দমনে আরও মার্কিন সহায়তা চাইলেও ট্রাম্প আপাতত সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাইছেন না। গত বছরের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও হুতিদের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, সেটিও তিনি ভাঙেননি। গত মাসে ট্রাম্প দাবি করেন, হুতিরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায় না। হুতিদের একজন কর্মকর্তা লিখিত বার্তায় জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েমেনের সংঘাতের সঙ্গে আবার জড়িয়ে পড়ার কোনো কারণ নেই।

ইয়েমেনবিষয়ক সাবেক মার্কিন বিশেষ দূত টিম লেন্ডারকিং মনে করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পরিণতি এখনো অস্পষ্ট হওয়ায় ট্রাম্প নতুন একটি যুদ্ধের ফ্রন্ট খোলার ব্যাপারে অনীহা দেখাচ্ছেন। ইরান হুতিদের অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা দেয় এবং উভয় পক্ষই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। বিশ্ববাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা তাদের হাতে একটি বড় চাপের মাধ্যম। তবে হুতিদের কেবল ইরানের ‘প্রক্সি’ হিসেবে দেখা ভুল হবে। বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, হুতিদের নিজস্ব ইতিহাস, ক্ষোভ ও রাজনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাদের প্রধান অভিযোগগুলোর একটি হলো ইয়েমেনের ওপর অবরোধ। হুতিদের ভাষায়, তারা নিজেদের দেশ রক্ষার জন্যই লড়ছে।

ওয়াশিংটন এখনো সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে এবং দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। হোয়াইট হাউসও বলেছে, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের পাশে থাকবে। কিন্তু হুতিদের বিরুদ্ধে আবার বড় মার্কিন সামরিক অভিযান চালানোর জন্য ট্রাম্পকে চাপ দেওয়া হচ্ছে—এমন লক্ষণ নেই। এর একটি কারণ গত বছরের ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ অভিযানের অভিজ্ঞতা, যা হুতিদের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারেনি। এছাড়া ইরানের যুদ্ধের কারণে মার্কিন অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতেও চাপ তৈরি হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি নিয়ে বিশ্লেষকদের সতর্কতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যনীতি সম্পর্কে অবহিত এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, রুবিও এই জটিলতা বোঝেন এবং খেলোয়াড়দের বিষয়ে তাঁর ভালো ধারণা আছে।

ওয়াশিংটনে অবশ্য এ বিষয়ে সবাই একমত নয়। কেউ কেউ মনে করেন, সৌদি আরবকে সহায়তা করতে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা কমানোর জন্য বিমান হামলা চালানো উচিত। অন্যরা সতর্ক করছেন, এমনকি মার্কিন স্থলসেনা পাঠালেও হুতিদের থামানো সহজ হবে না। কারণ হুতিরা গত কয়েক বছরে অনেক শক্তিশালী হয়েছে। তারা নিজেদের অস্ত্র তৈরি করছে, ইরান থেকে পাওয়া অস্ত্রের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে এবং তাদের অস্ত্রভান্ডারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও শুরু হয়েছে বলে খবর রয়েছে। ইয়েমেন যুদ্ধ পর্যবেক্ষণকারী এক পশ্চিমা কর্মকর্তা জানান, হুতিরা ক্ষেপণাস্ত্রের ওজন কমিয়ে পাল্লা বাড়িয়েছে এবং গাইডেন্স ব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা এপ্রিল অ্যালির মতে, হুতি নেতৃত্বের বড় অংশ তরুণ এবং যুদ্ধের মধ্যেই বড় হওয়ায় তাদের সক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে।

হুতি-সমর্থক ইয়েমেনি সাংবাদিক হুসেইন আল-বুখাইতি অবশ্য ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি দুর্বল হওয়ার জন্য সৌদি আরবকেই দায়ী করেন। তাঁর দাবি, সৌদি অবরোধ তুলে না নেওয়ায় পরিস্থিতি বদলায়। তবে হুতিদের শাসনব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এবং এক মানবিক সহায়তা কর্মকর্তা হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় জীবনকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদ এখন হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা ট্রাম্পের জন্য দূরে থাকা আরও কঠিন করে তুলতে পারে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, নতুন যুদ্ধ এড়াতে চাইলেও ওয়াশিংটন কূটনৈতিক পথে খুব বেশি শক্তি দিচ্ছে না। ইয়েমেন বা সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো রাষ্ট্রদূত নেই এবং এই সংঘাত নিয়ে কোনো বিশেষ দূতও নেই। সাবেক জাতিসংঘ বিশেষ দূত মার্টিন গ্রিফিথস জানিয়েছিলেন, হুতিদের প্রকৃত উদ্দেশ্য খুঁজে বের করা সহজ নয়। ট্রাম্পের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো, আরেকটি যুদ্ধ শুরু না করেও কীভাবে হুতিদের সামলানো যায়। ইয়েমেনের ইতিহাস বলছে, সামরিক শক্তির চেয়ে কূটনৈতিক মনোযোগই হয়তো এই সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের জন্য বেশি জরুরি।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin