আন্তর্জাতিক আইনের প্রসার, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিতে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী ও বিচারক নাভানেথেম ‘নাভি’ পিলাই। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নরওয়ের রাজধানী অসলো থেকে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম ঘোষণা করে।
কমিটির চেয়ারম্যান ইয়র্গেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেস জানান, আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করতে এবং গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে নাভি পিলাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। নোবেল কমিটি তাদের মূল্যায়নে উল্লেখ করেছে, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা—সবখানেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও নিপীড়িত মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তাঁর দৃঢ় অঙ্গীকার প্রতিফলিত হয়েছে। এবারের এই পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, যা প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। আগামী ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে অসলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার হস্তান্তর করা হবে।
১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত তামিল পরিবারে জন্ম নেন নাভি পিলাই। বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার চরম বৈষম্যমূলক পরিবেশে বেড়ে উঠে তিনি পরবর্তী সময়ে আইন পেশাকে বেছে নেন। বর্ণবাদ ও প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনি নেলসন ম্যান্ডেলাসহ অন্যান্য বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকারীদের পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়েছিলেন, যা তাঁর পরবর্তী আন্তর্জাতিক বিচারিক ক্যারিয়ারের মজবুত ভিত্তি গড়ে দেয়।
আইনজীবী হিসেবে সফলতার পর পিলাই দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রাখেন। ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যার পর গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালন ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পরবর্তীতে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও (আইসিসি) বিচারক হিসেবে কাজ করেন, যা যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অপরাধের ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণে কাজ করে থাকে। নোবেল কমিটির মতে, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার বিচার না হলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূখণ্ড, পূর্ব জেরুজালেম ও ইসরায়েলবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন পিলাই। এছাড়া মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) চলমান মামলার মতো বিষয়গুলোর প্রেক্ষাপটে তাঁর বিচারিক অবদান বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। নোবেল কমিটি মনে করে, বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতের মধ্যে আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ছে, তখন আইনের শাসন ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থার গুরুত্ব মনে করিয়ে দিতেই নাভি পিলাইকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিল জাপানের পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী সংগঠন ‘নিহন হিদানকিও’। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯০১ সালে পুরস্কারটি প্রবর্তনের পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মোট ১১২ জন ব্যক্তি ও ২৮টি সংগঠন নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে।





