প্রমথ চৌধুরীর পৈতৃক ভিটা সংরক্ষণের আকুল দাবি চাটমোহরে

Published: October 30, 2026, 1:48 pm

পাবনার চাটমোহর উপজেলার ঐতিহাসিক হরিপুর গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষারীতির প্রবর্তক প্রমথ চৌধুরীর পৈতৃক নিবাস। উপযুক্ত পরিচর্যা, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাংলা সাহিত্যের এই উজ্জ্বল স্মৃতিচিহ্নটি সময়ের বিবর্তনে মলিন ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পড়ছে। কোনোমতে টিকে থাকা অবশিষ্টাংশ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অমূল্য শেকড় হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা।

সম্প্রতি প্রমথ চৌধুরীর এই স্মৃতিবিজড়িত নিবাস পরিদর্শনে এসে স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা মনে করিয়ে দেন ইসাক আলী নামে এক দর্শনার্থী। জায়গাটি ঘুরে দেখার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে এসে মনে হলো, সময়ের প্রবাহে অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও সভ্যতা ও ইতিহাসের কিছু স্মৃতিচিহ্ন এখনো নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো শুধু পুরোনো স্থাপনা নয়, আমাদের অতীতের পরিচয়।’ ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদ থেকে তিনি চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি পৈতৃক ভিটাটি জরুরি সংস্কার ও উন্নয়নের মাধ্যমে দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে তোলার জোর দাবি জানান। পাশাপাশি এলাকার শতবর্ষী গাছপালা, সাংস্কৃতিক নিদর্শন ও প্রাচীন স্থাপনা সংরক্ষণে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান।

বাংলা গদ্যের প্রচলিত সাধুরীতি ভেঙে সহজ, প্রাণবন্ত ও সাবলীল চলিত ভাষারীতি প্রতিষ্ঠা ও প্রসারে প্রমথ চৌধুরীর ভূমিকা চিরস্মরণীয়। ১৮৬৮ সালের ৭ আগস্ট যশোর জেলায় জন্ম নেওয়া এই সাহিত্যিকের বাবা দুর্গাদাস চৌধুরী; তবে তাঁদের মূল শেকড় ও পৈতৃক নিবাস ছিল পাবনার চাটমোহরের হরিপুর গ্রামে। ‘বীরবল’ ছদ্মনামে সাহিত্যচর্চা করা প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত ‘সবুজপত্র’ পত্রিকা বাংলা সাহিত্যজগতে এক নতুন গতির সঞ্চার করেছিল। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থের তালিকায় রয়েছে ‘বীরবলের হালখাতা’, ‘তেল-নুন-লাকড়ি’, ‘নানাকথা’, ‘রায়তের কথা’ ও ‘আমাদের শিক্ষা’। গল্পগ্রন্থ ‘চার-ইয়ারী কথা’, ‘আহুতি’ ও ‘নীললোহিত’ এবং কাব্যগ্রন্থ ‘সনেট পঞ্চাশ’ ও ‘পদচারণ’ সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে আজও সমাদৃত। ১৯৪৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর তিনি প্রয়াত হন, তবে তাঁর সাহিত্যকর্ম বাংলা ভাষায় অমর হয়ে রয়েছে।

পাবনা জেলা প্রশাসনের পর্যটনবিষয়ক তালিকাতেও হরিপুরের এই পৈতৃক ভিটার নাম যুক্ত রয়েছে। সাহিত্যিকের স্মৃতি টিকিয়ে রাখতে সেখানে পূর্বে ‘প্রমথ চৌধুরী স্মৃতি পাঠাগার’ প্রতিষ্ঠা ও উদ্বোধন করা হলেও শুধু একটি পাঠাগার বা স্মৃতিফলক স্থাপনই ঐতিহ্য রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত নয়। ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে ইসাক আলী বলেন, ‘আমরা শুধু বর্তমানকে নিয়ে বাঁচতে চাই না, অতীতের ইতিহাস থেকেও শিক্ষা নিতে চাই। আমাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি, প্রাচীন স্থাপনা, ঐতিহ্যবাহী গাছপালা ও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি। আজ আমরা যদি এগুলো রক্ষা করতে না পারি, তাহলে আগামী প্রজন্মের কাছে আমাদের ইতিহাস তুলে ধরার মতো অনেক কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ভিটার অবশিষ্ট স্থাপনা ও প্রত্ননিদর্শনগুলো বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণ করে প্রমথ চৌধুরীর জীবন ও সাহিত্য অবদান নির্ভর একটি স্মৃতি জাদুঘর, তথ্যকেন্দ্র এবং আধুনিক পাঠাগার তৈরি করা সম্ভব। এটি সম্ভব হলে এলাকাটিতে পর্যটনবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে এবং বহু গবেষক, শিক্ষার্থী ও সাহিত্যপ্রেমীর আনাগোনা বাড়বে, যা স্থানীয় পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক গতি আনবে। সময় পার হয়ে যাওয়ার আগেই হরিপুরের এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে বাঁচিয়ে তুলে একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক পাঠশালায় রূপ দেওয়ার দাবি এখন সময়ের দাবি।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin