পাকিস্তানের দুই প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ইমরান খান ও মাওলানা ফজলুর রহমান—এ দুজনের মধ্যে অবিশ্বাসের দেয়াল ছিল অনেক গভীর। শেষ পর্যন্ত শাহবাজ শরিফ সরকারের ভুল পদক্ষেপই তাঁদের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। আমি কখনো কল্পনাও করিনি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রধান এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য মাওলানা ফজলুর রহমান ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে সোচ্চার ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগ দেবেন। কয়েক বছর আগে মাওলানা প্রকাশ্যেই ইমরান খানকে ‘জায়নবাদী এজেন্ট’ আখ্যা দিয়েছিলেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক সমাবেশে খান তাঁকে ‘মাওলানা ডিজেল’ বলে বিদ্রূপ করতেন। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে বেনজির ভুট্টোর সরকারের আমলে মাওলানা ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ডিজেল বা জ্বালানি তেলের পারমিট নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল, সেখান থেকেই এই বিদ্রূপাত্মক নামের উৎপত্তি। অথচ আজ তিন বছর ধরে কারাবন্দী ইমরান খানের শেষ ভরসা হয়ে উঠেছেন সেই মাওলানা।
ইমরান খানের জনপ্রিয়তা এখনো গণ-আন্দোলনে রূপ নিতে পারেনি, যার পেছনে তাঁর নিজের দলের ভেতরে থাকা কিছু অন্তর্ঘাতকেরও ভূমিকা রয়েছে। তিনি জানেন, বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে মানুষকে রাজপথে নামাতে পারেন একমাত্র মাওলানাই, যিনি খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের দ্বিতীয় জনপ্রিয় নেতা। ১৯৮৮ সাল থেকে আমি এই দুই নেতাকেই চিনি। সে বছর পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউল হক দুর্নীতির অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ খান জুনেজোকে বরখাস্ত করেন। জুনেজো পাকিস্তান মুসলিম লিগের নেতা ছিলেন এবং ১৯৮৫ সালের নির্দলীয় নির্বাচনের পর জিয়াউল হক নিজেই তাঁকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছিলেন। জুনেজোকে সরিয়ে দেওয়ার পর জিয়াউল হক নতুন সরকারে ইমরান খানকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলেন। ইমরান ১৯৮৭ সালে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছিলেন, কিন্তু জেনারেলের অনুরোধে তিনি আবার ক্রিকেটে ফিরে আসেন। জেনারেলের ধারণা ছিল, ইমরান খানকে পাশে পেলে ক্ষতিগ্রস্ত নিজের ভাবমূর্তি কিছুটা পুনরুদ্ধার করতে পারবেন। আমি তখন সাংবাদিকতায় নতুন, খবর পেলাম ইমরান খানকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তিনি আমার পরামর্শে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তবে খবরটি প্রকাশ করায় তিনি আমার ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালে সরকারে যোগ দিলে হয়তো ১৯৯২ সালে পাকিস্তানকে ক্রিকেট বিশ্বকাপ জেতানোর নেতৃত্ব তিনি দিতে পারতেন না।
প্রায় একই সময়ে ‘সিল্ক লেটার মুভমেন্ট’ বা ‘তেহরিক-ই-রেশমি রুমাল’ নিয়ে একজন জার্মান পণ্ডিতের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম, যা মাওলানা ফজলুর রহমানের সঙ্গে আমার শ্রদ্ধাপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা করে। ১৯৯০ সালে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন কুয়েত আক্রমণ করলে পাকিস্তানজুড়ে সাদ্দামপন্থী বিক্ষোভ শুরু হয়। ইমরান খান তখন বলেছিলেন, ‘যে সাদ্দামের পক্ষে নয়, সে মুসলমান নয়।’ সেই প্রথম আমি মাওলানা ফজলুর রহমানকে ইমরান খানের প্রশংসা করতে শুনি। ২০০২ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ নির্বাচনের মাধ্যমে তাঁর অসাংবিধানিক শাসনকে বৈধতা দিতে চাইলে, রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগার থেকে আসিফ আলী জারদারি মাওলানা ফজলুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করার উদ্যোগ নেন। তখন নওয়াজ শরিফ ও ইমরান খান—উভয়েই মাওলানাকে প্রধানমন্ত্রী পদে সমর্থন দিয়েছিলেন। আমার মনে আছে, সে সময় কেউ বেয়াদবি করে মাওলানাকে ‘মাওলানা ডিজেল’ বলে ডাকলে ইমরান খান তাঁর সঙ্গে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়তেন।
মাওলানার ভাষ্যমতে, ইমরান খানকে কারাবন্দী করার পাশাপাশি তাঁর পরিবারের সব নারী সদস্যকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে গভর্নরের শাসন জারি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।’ ‘মাওলানা ডিজেল’ বিদ্রূপাত্মক নামটি ১৯৯৫ সালে নওয়াজ শরিফের সমর্থকেরা চালু করেছিলেন। ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ইমরান খান বিভিন্ন সমাবেশে মাওলানাকে একই নামে বিদ্রূপ শুরু করেন। ২০১৯ সালে আমার নেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাওলানা ইমরান খানকে ‘জায়নবাদী এজেন্ট’ বলে আখ্যা দেন এবং সেই বছরই লংমার্চের ঘোষণা দেন। তখন সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া, যিনি প্রায়ই সাংবাদিকদের ডেকে বলতেন মাওলানা ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআইসিক্সের হয়ে কাজ করেন। অথচ জেনারেল বাজওয়া নিজেই ইসরায়েলের সঙ্গে বন্ধুত্বের উপকারিতা তুলে ধরতেন। এরপর পাকিস্তান মুসলিম লিগ (এন) ও পাকিস্তান পিপলস পার্টি ইমরান খানের বিরুদ্ধে মাওলানাকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২০২০ সালে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (পিডিএম) গঠিত হয়।
ইমরান খান মাওলানার দুর্নীতির প্রমাণ খুঁজতে সব গোয়েন্দা সংস্থা ও জাতীয় জবাবদিহি ব্যুরোকে (ন্যাব) কাজে লাগান। আইএসআইপ্রধান জেনারেল ফয়েজ হামিদ ব্যক্তিগতভাবে পছন্দের সাংবাদিকদের দিয়ে মাওলানার বিরুদ্ধে মিথ্যা খবর প্রচার করান। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ খুঁজে পায়নি। আইএসআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল নুসরাত নাইম আমাকে জানিয়েছিলেন, একবার তিনি জেনারেল মোশাররফের পক্ষে মাওলানার সমর্থন আদায়ের জন্য টাকাভর্তি ব্যাগ দিলেও মাওলানা তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। ইসরায়েলের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার ব্যাপারে জেনারেল বাজওয়ার আগ্রহ ইমরান খানের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি করে। ২০২২ সালে সেনাপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার বিরোধকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী দলগুলো অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ক্ষমতা হারানোর পর ইমরান খান মাওলানার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং জোট গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তত দিনে আইএসআইয়ের নতুন প্রধান জেনারেল নাদিম আনজুম পাকিস্তান মুসলিম লিগ (এন) ও পাকিস্তান পিপলস পার্টিকে মাওলানার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন।
মাওলানা ২০১০ সালে লাহোরের জামিয়া আশরাফিয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আলেমদের একত্র করে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সর্বসম্মত ঘোষণা গ্রহণে রাজি করিয়েছিলেন। ওই ঘোষণা দেওয়ার পর সোয়াবি, চারসাদ্দা ও কোয়েটায় পরপর আত্মঘাতী হামলার শিকার হয়েও তিনি রাজনীতিতে জঙ্গিবাদের বিরোধিতা থেকে সরে আসেননি। ২০২৪ সালের নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে কারাগার থেকে ইমরান খান তাঁকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, ‘জোট গঠনের জন্য আপনারা যত শর্ত দিতে চান, দিন। আমি চোখ বন্ধ করে সেসব মেনে নেব।’ কিন্তু মাওলানা বিনয়ের সঙ্গে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ একসময় তিনি নিজেই ইমরান খানকে জায়নবাদী এজেন্ট বলেছিলেন। এখন ইমরান খান কারাগারে এবং শাহবাজ শরিফ সরকারের কর্তৃত্ববাদী কৌশলের বিরুদ্ধে মাওলানা জোরালো কণ্ঠ হয়ে উঠেছেন। ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাওলানার বিরুদ্ধে সরকার-সমর্থিত ভুয়া ভিডিও ও ভিত্তিহীন অভিযোগে সয়লাব হয়ে গেছে। রাজনৈতিক জীবনে ১১ বার গ্রেপ্তার হওয়া মাওলানা এবার দ্বাদশবার গ্রেপ্তার হতেও প্রস্তুত। ইমরান খান যেমন ক্ষমতা হারানোর পর মাওলানার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছেন, তেমনি পাকিস্তান মুসলিম লীগ (এন)-ও ক্ষমতা হারানোর পর তাঁকে মনে করবে। তবে এবার হয়তো মাওলানা আর তাদের পাতা ফাঁদে পা দেবেন না।
পরিকল্পনাটি সফল হলে ১৯১৬ সালেই ভারত স্বাধীনতা অর্জন করতে পারত।.ইমরান খান কি ভুট্টোর ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছেন.লাহোরে একবার মাওলানা ফজলুর রহমানের সঙ্গে দেখা হলে তিনি আমার সেই সাক্ষাৎকারটির ভূয়সী প্রশংসা করেন।





