বিশ্বজুড়ে কেন উত্তাল তরুণ প্রজন্মের বিদ্রোহ

Published: October 25, 2026, 10:51 am

তরুণ প্রজন্ম বরাবরই নবযুগের অগ্রদূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দুই দশক আগে উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল থেকে যে প্রতিবাদের আওয়াজ উঠেছিল, তা আজ বিশ্বব্যাপী প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মরক্কো, তিউনিসিয়া ও মিসরের তরুণদের সাধারণ দাবি—কাজ, শিক্ষা ও মর্যাদা—আজ এশিয়া থেকে লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত এক অগ্নিবীজে পরিণত হয়েছে। জেনারেশন জেড বা ডিজিটাল যুগের এই সন্তানেরা কেবল ভোগবাদী নয়, বরং তারা লড়াই করতে ও প্রাণ দিতে জানে।

২০২৪ সালে ঢাকার রাস্তায় যে তরঙ্গ উঠেছিল, তা ছিল দুর্নীতি, বৈষম্য ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে এক অভূতপূর্ব জাগরণ। শিক্ষার্থী, পোশাকশ্রমিক থেকে শুরু করে স্কুলপড়ুয়া কিশোর—সবাই মিছিলে শামিল হয়েছিল। এই আন্দোলনের ফলে সরকার শুধু পতনই ঘটায়নি, বরং সপরিবার দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল, যা ইতিহাসের পাতায় বিরল। একই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে নেপালে সরকার ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করলে তরুণদের রক্তে আগুন জ্বলে ওঠে। কাঠমান্ডুর সংসদ ভবনে আগুন জ্বলেছিল এবং প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

ইন্দোনেশিয়ার সংসদ সদস্যরা যখন নিজেদের জন্য ন্যূনতম মজুরির ১০ গুণ বেশি বিলাসবহুল বাসস্থান ভাতা ঘোষণা করে, তখন তরুণরা ‘ওয়ান পিস’ কার্টুনের পাইরেট পতাকা হাতে রাস্তায় নেমেছিল। তারা নিজেদের জলদস্যু নয়, বরং স্বাধীনতার যোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করেছিল। মাদাগাস্কারেও বিদ্যুৎ ও পানির সংকটের প্রতিবাদে ২০২৫ সালে তরুণরা রাস্তায় নেমে বলেছিল, ‘আমাদের অন্ধকারে তোমাদের প্রাসাদ জ্বলবে না।’ এর ফলে প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল, যা আফ্রিকার মাটিতে চিরন্তন বাণীর প্রতিধ্বনি হিসেবে কাজ করেছে।

ইউরোপের দেশগুলোতেও অর্থনৈতিক সংকট, শিক্ষাব্যবস্থার ভাঙন ও বাসস্থানের উচ্চমূল্য তরুণদের রাজপথে নামিয়েছে। ফ্রান্সে শিক্ষক সংকট ও ভাঙা ছাদ, স্পেনে গত এক দশকে বাড়িভাড়া ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি এবং আলবেনিয়ায় পরিবেশ রক্ষার নামে শুরু হওয়া ‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লব’ আজ দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। বেলজিয়াম ও অস্ট্রিয়ায় শিক্ষার বাজেট কাটছাঁটের বিরুদ্ধে ছাত্ররা বিক্ষোভ করছে। দিল্লিতেও তরুণরা নির্বাচন ও গণতন্ত্রের স্বচ্ছতার দাবিতে সোচ্চার হয়েছে, যেখানে ভোটের তালিকায় নাম অনিশ্চিত হওয়ার মতো বিষয়গুলো গণতন্ত্রের ভিতে ফাটল ধরিয়েছে বলে তারা মনে করছে।

এই আন্দোলনগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার। টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, ডিসকর্ড ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে স্লোগান ও প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। তবে শাসকরা প্রায়ই এই আন্দোলনকে দমনের জন্য রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, বিদেশি ষড়যন্ত্র বা বিশৃঙ্খলার দোহাই দেয়। রক্ষণশীলরা তরুণদের অপরিণত বলে অভিহিত করলেও ইতিহাস সাক্ষী যে, পরিবর্তনের চাবিকাঠি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তরুণদের হাতেই থাকে।

সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখার চেয়ে গভীর সামাজিক অসন্তোষের লক্ষণ হিসেবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। তবে আন্দোলনের আবেগ যাতে ক্ষণস্থায়ী না হয়, সেজন্য তরুণদের সুসংগঠিত রাজনৈতিক কর্মসূচি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমান প্রবণতা বলছে, তরুণদের আন্দোলন মূলত গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। তবে একটি সতর্কবার্তাও আছে—যে শক্তি পরিবর্তনের আগুন জ্বালায়, সেই শক্তি যদি সুসংগঠিত রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতে ও প্রতিষ্ঠান গড়তে না পারে, তবে আন্দোলনের আবেগ ক্ষণস্থায়ী হতে পারে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo