প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২৬ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় এই সফরের মূল অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এবং বিনিয়োগ। তবে এসব প্রত্যাশাকে টেকসই অর্জনে রূপান্তর করতে হলে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি ও তার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল স্বাধীনতা-পরবর্তী পুনর্গঠনের সময় থেকেই। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাপান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু হয়। গত পাঁচ দশকে বিভিন্ন সরকারের আমলেই এই সহযোগিতার ধারা অব্যাহত রয়েছে। যমুনা বহুমুখী সেতু থেকে শুরু করে ঢাকার মেট্রোরেল ও যমুনা রেলসেতুর মতো বড় প্রকল্পে জাপানের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের ‘বিগ-বি’ (বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট) উদ্যোগ অবকাঠামো ও শিল্প সংযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে মাতারবাড়ী ও আড়াইহাজার প্রকল্প। এখন চালু প্রকল্পের অর্জন ও নির্মাণাধীন উদ্যোগের সম্ভাবনাকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় ব্যবসায় সুফল বাড়ানো প্রয়োজন।
আগামী ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কার্যকর হতে যাওয়া অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএর সুফল ঘরে তুলতে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। চুক্তি কার্যকর করার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া, শুল্কবিধান, পণ্যের উৎসের নিয়ম, সনদ ও কাস্টমস পদ্ধতি নিয়ে যৌথ কর্মপরিকল্পনা দরকার। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের জন্য বিশেষ নির্দেশিকা এবং কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করলে পোশাকশিল্পের বাইরেও চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও হালকা প্রকৌশল খাতের বাজার সম্প্রসারণ সহজ হবে। বাজারসুবিধাকে স্থায়ী বাণিজ্যে রূপ দিতে মান, সময়ানুবর্তিতা ও ধারাবাহিক সরবরাহ অপরিহার্য।
বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে জমি, বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন সংযোগ ও অনুমোদনব্যবস্থাসহ সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন ফলপ্রসূ হতে পারে। আড়াইহাজার অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক উপকরণ, প্যাকেজিং ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে সম্ভাব্যতা যাচাই করা যায়। স্থানীয় সরবরাহকারী, দক্ষ কর্মী ও বাজারের চাহিদা বিবেচনায় বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি জাপানি মাঝারি প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগ উৎসাহিত করা প্রয়োজন। প্রশাসনিক নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে বিনিয়োগকারীর সমস্যা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং দেশীয় ব্যবসার জন্য একই ধরনের সংস্কার বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় করবে।
অবকাঠামো সহযোগিতার ক্ষেত্রে মাতারবাড়ী বন্দর ও মহেশখালী-মাতারবাড়ী এলাকার উন্নয়নকে সড়ক, রেল, গুদাম, কাস্টমস ও শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল কাস্টমস, ঝুঁকিভিত্তিক পরীক্ষা, পরিচালন প্রশিক্ষণ ও তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমানোর যৌথ কর্মসূচি নেওয়া যায়। নতুন প্রকল্পে ঋণের শর্ত, বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধের দায়, ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বিবেচনা করলে সহযোগিতার অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব বাড়বে। মানবসম্পদ উন্নয়নে ২০১৯ সালের দক্ষ কর্মী-সংক্রান্ত কাঠামোকে নিয়োগদাতার বাস্তব চাহিদার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন। যৌথ পাঠক্রমে ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ, নিয়োগ চুক্তির স্বচ্ছতা, অসাধু মধ্যস্থতা প্রতিরোধ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি গুরুত্ব পেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হওয়া উচিত বিদেশে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দেশের উৎপাদন ও জ্ঞানভিত্তি সমৃদ্ধ করা। জাপানি প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ, বাংলাদেশে যৌথ কারখানা এবং প্রত্যাবর্তনকারী কর্মীদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগকে একই পরিকল্পনায় আনা যায়। সত্তরের দশকের শেষভাগে দক্ষিণ কোরিয়ার দাইয়ুর সহযোগিতায় বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে যে জ্ঞান ছড়িয়ে পড়েছিল, বর্তমান অংশীদারত্বেও প্রকল্প শেষে দেশে কী দক্ষতা থেকে যাচ্ছে তা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জাপানি অংশীদারদের যৌথ গবেষণা ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। প্রযুক্তি সংগ্রহের সঙ্গে পরিচালনা, মেরামত ও স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযোজনের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
পরিবেশ ও জ্বালানি খাতে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর সমঝোতাকে কাজে লাগিয়ে শিল্পে জ্বালানি সাশ্রয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও দুর্যোগ প্রস্তুতির সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে। জাপানকে ঘিরে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের সুসংহত পূর্ব এশিয়া কৌশলের অংশ হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের উন্নয়নকেন্দ্রিক কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব। বঙ্গোপসাগরের অবস্থান কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার বাজার ও পূর্ব এশিয়ার উৎপাদনব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর সংযোগস্থল হতে পারে। সফর শেষে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, সময়সীমা ও পর্যালোচনা পদ্ধতিসহ বাস্তবায়ন তালিকা প্রকাশ সহায়ক হবে। পাঁচ দশকের আস্থা পরবর্তী দশকের শিল্পায়নের ভিত্তি হতে পারে, যদি অবকাঠামোর সঙ্গে উৎপাদন এবং অভিবাসনের সঙ্গে জ্ঞান যুক্ত হয়।





