ইসলামের ইতিহাস ও দর্শনে চার পুরুষের উত্থান-পতনের গতিপথ

Published: October 17, 2026, 5:51 am

জগতে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাস, ধর্ম ও মানব মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনো পরিবার, গোত্র বা জাতির উত্থান ও পতনের সময়কাল মূলত চার প্রজন্ম বা চার পুরুষজুড়ে বিস্তৃত থাকে। ক্ষণস্থায়ী এই পৃথিবীতে মানুষের অর্জিত মর্যাদা, পুণ্য ও বংশীয় সুনামের একটি নির্দিষ্ট জীবনচক্র রয়েছে, যা চার প্রজন্মের একটি স্বাভাবিক গতিপথের মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত হয়।

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর 'যে সত্যের মৃত্যু নেই' গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ১৯৬-১৯৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ১৯৮৭) চার পুরুষের এই জীবনচক্রের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রথম পুরুষ হলেন মূল ভিত্তি ও সংগ্রামী। বহু কষ্ট, সাধনা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে তাঁরা ভালো গুণাবলি অর্জন করেন, শিক্ষার বিস্তার ঘটান কিংবা রাজ্য ও ধর্মের ভিত্তি সুদৃঢ় করেন। দ্বিতীয় পুরুষ হলেন অনুসারী, যাঁরা পিতার ত্যাগ ও সাফল্য প্রত্যক্ষ করে সেই পথেই হাঁটেন। তবে ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে না পারায় তাঁদের হাতেই ঐক্যের দেয়ালে প্রথম সূক্ষ্ম ফাটল ধরে। তৃতীয় পুরুষকে বলা যায় শিথিলকারী; সংগ্রাম তাঁদের কাছে শুধুই গল্প হওয়ায় সুবিধার খাতিরে কিছু ঐতিহ্য রক্ষা করেন আর কিছু ছেড়ে দেন, ফলে অবক্ষয় আরও বাড়ে। পরিশেষে, চতুর্থ পুরুষ হয় অহংকারী ও পতনমুখী। পূর্বপুরুষদের খ্যাতিকে চিরস্থায়ী মনে করে তারা পরিশ্রম ত্যাগ করে, ফলে তাদের অজেয় দুর্গ ধসে পড়ে এবং গৌরব অন্য কোনো যোগ্য ও পরিশ্রমী সম্প্রদায়ের কাছে স্থানান্তরিত হয়।

ইসলামি শাস্ত্রীয় ঐতিহ্য ও ইতিহাসে চার পুরুষের এই আয়ুষ্কালের ধারাবাহিকতার বহু প্রমাণ পাওয়া যায়। সুরা মায়েদার ৯৩ নম্বর আয়াতে ইমান ও সৎ কাজের মাধ্যমে চার স্তরের রূপান্তরের মাধ্যমে পূর্ণতার ইঙ্গিত করা হয়েছে। একইভাবে মহানবী (সা.) হজরত ইউসুফ (আ.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও বংশমর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে চার পুরুষের ধারাবাহিকতা উল্লেখ করেন। সহিহ বুখারির ৩৩৯০ নম্বর হাদিসে ইউসুফ (আ.)-কে ‘সম্মানিত ব্যক্তি, তিনি সম্মানিত ব্যক্তির সন্তান, তিনি সম্মানিত ব্যক্তির সন্তান, তিনি সম্মানিত ব্যক্তির সন্তান’—অর্থাৎ ইউসুফ ইবনে ইয়াকুব ইবনে ইসহাক ইবনে ইব্রাহিম (আলাইহিমুস সালাম) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এ ছাড়া সহিহ বুখারির ২৬৫১ নম্বর হাদিসে মহানবী (সা.) তাঁর নিজস্ব যুগ, সাহাবিদের যুগ এবং তাবেয়িদের যুগের প্রশংসা করেছেন। তিনি চতুর্থ যুগের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি, কারণ ইতিহাস প্রমাণ করে যে চতুর্থ যুগ থেকেই পতনের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

ঐতিহাসিক নানা ঘটনাতেও চার প্রজন্মের সামাজিক ক্ষমতার এমন আবর্তনের দৃষ্টান্ত রয়েছে। পারস্যের বাদশাহ নওশেরোওয়ার সঙ্গে আরবের শ্রেষ্ঠ গোত্র সম্পর্কে আলোচনার সময় নোমান জানিয়েছিলেন, যেসব বংশে টানা তিন বা চার পুরুষ ধরে যোগ্য নেতা জন্ম নেন, তারাই আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ গোত্র। ইবনে আবদ রাব্বিহ আল-আন্দালুসির 'আল-ইকদ আল-ফারিদ' (১/২৭৪-২৭৮, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়াহ, বৈরুত, ১৯৮৪) গ্রন্থানুসারে, এ কথা শুনে নওশেরোওয়া সেই খানদানের প্রতিনিধি হোজাইফা ইবনে বুদাইল ফিরাসিকে ডেকে মর্যাদার সনদ প্রদান করেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালিত হতো শুরা ও নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে। কিন্তু কালক্রমে সেই শক্তি কেন্দ্রচ্যুত হয়ে সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তিতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং খেলাফত রাজতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়।

ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবস্থার এই অভ্যন্তরীণ ব্যাধি একটা সময় পুরো সমাজকে অবসন্ন করে ফেলে। এটি কোরআনের সুরা রুমের ৪১ নম্বর আয়াতের সেই সতর্কবার্তার বাস্তব রূপ, যেখানে বলা হয়েছে যে জল ও স্থলে যা কিছু বিপর্যয় দেখা দেয়, তা মানুষের স্বহস্তে উপার্জিত ফল। বর্তমানে সমাজে নৈতিকতার সজীবতা কিছুটা কমলেও তার আসল ভিত্তি বা কাঠামো এখনো ধ্বংস হয়ে যায়নি। ব্যক্তিনির্ভরতার বদলে সামাজিক ভিত্তিকে মজবুত করা এবং সঠিক আদর্শিক পদ্ধতি গ্রহণ করাই এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজকে পুনরায় নতুন প্রাণস্পন্দনে জাগিয়ে তোলার শ্রেষ্ঠ উপায়। নিবন্ধটি লিখেছেন গাজীপুরের বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্সের শিক্ষক মাহমুদ হাসান ফাহিম।

তারা ধরে নেয় এই উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত খ্যাতি চিরস্থায়ী।.১.

ফলে তাদের হাতে ঐক্যের দেয়ালে প্রথম সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দেয়।৩.

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo