দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা হাজার হাজার মামলা বছরের পর বছর ধরে নিম্ন ও উচ্চ আদালতে আটকে থাকায় দুর্নীতির বিচার প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত হিসাব বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিম্ন আদালতে ৩ হাজার ৩৪৭টি এবং উচ্চ আদালতে ৪ হাজার ৮৪৬টিসহ মোট ৮,১৯৩টি দুর্নীতির মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তবে এর বিপরীতে মামলার নিষ্পত্তির গতি অত্যন্ত ধীর। গত আট মাসে নিম্ন আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২৮৪টি মামলা, যার মধ্যে প্রায় ৪৭ শতাংশ অর্থাৎ ১৩২টি মামলাতেই আসামিরা খালাস পেয়েছেন।
দুদকের প্রসিকিউশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন আদালতে ঝুলে থাকা ৩ হাজার ৩৪৭টি মামলার মধ্যে ৩ হাজার ১৯টি দুদকের নিজস্ব এবং ৩২৮টি বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর আমলের। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৭৪টি মামলার বিচারকাজ চলমান থাকলেও উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে ৪৭৩টি মামলার বিচার কার্যক্রম পুরোপুরি থমকে আছে, যা মোট বিচারাধীন মামলার প্রায় ১৪ শতাংশ। দুদকের ৩ হাজার ১৯টি বিচারাধীন মামলার মধ্যে ৮০৫টি ঢাকার আদালতে এবং বাকিগুলো ঢাকার বাইরের আদালতগুলোতে চলছে। এসব মামলার মধ্যে ৩০৪টি স্থগিত ও ২,৭১৫টির বিচার চলছে। অন্যদিকে, বিলুপ্ত ব্যুরোর ৩২৮টি মামলার মধ্যে ১৬৯টি স্থগিত এবং ১৫৯টির বিচারিক কার্যক্রম চালু রয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিম্ন আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া ২৮৪টি মামলার মধ্যে ১৩৮টিতে সাজা, ১৩২টিতে খালাস এবং ১৪টি মামলা অন্যভাবে নিষ্পত্তি হয়। এর মধ্যে দুদকের নিজস্ব ২৬২টি মামলার মধ্যে ১৩১টিতে সাজা, ১১৮টিতে খালাস ও ১৩টি অন্যভাবে এবং বিলুপ্ত ব্যুরোর ২২টি মামলার মধ্যে সাতটিতে সাজা, ১৪টিতে খালাস ও একটি অন্যভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। নিষ্পত্তির এই গতি গত বছরের পুরো সময়ের চেয়ে কিছুটা বেশি হলেও বিশাল মামলার জটের তুলনায় তা অত্যন্ত নগণ্য। ২০২৫ সালে পুরো বছরে নিষ্পত্তি হয়েছিল ২৬৭টি মামলা, ২০২৪ সালে বিচারিক আদালতে ২৯৫টি (১৩৮টিতে সাজা, ১১৬টিতে খালাস ও ৪১টিতে অন্যভাবে) এবং ২০২৩ সালে মোট ৩৪১টি মামলা (দুদকের ৩০৩টি ও ব্যুরোর ৩৮টি) নিষ্পত্তি হয়েছিল।
উচ্চ আদালতেও একই ধরনের দীর্ঘসূত্রতা স্পষ্ট। হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ মিলে দুদকের মোট ৪ হাজার ৮৪৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে ৪,৬০৬টি এবং আপিল বিভাগে ২৪০টি মামলা ঝুলছে। হাইকোর্টে বিচারাধীন মামলার তালিকায় রয়েছে ১,০১১টি রিট, ১,৩০৩টি ক্রিমিনাল মিস, ১,৩২৭টি ক্রিমিনাল আপিল এবং ১,৩৬৫টি ক্রিমিনাল রিভিশন মামলা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগস্ট পর্যন্ত উচ্চ আদালতের দুই বিভাগে ৫৫৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, যার মধ্যে হাইকোর্টে ৪৭১টি এবং আপিল বিভাগে ৮৪টি। তবে কেবল চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট সময়কালে হাইকোর্টে ২৭৯টি এবং আপিল বিভাগে ৮৪টিসহ মোট ৩৫৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
বিচার প্রক্রিয়ার এই ধীরগতি কাটাতে বিশেষায়িত আদালত গঠন ও কমিশনের নিজস্ব স্থায়ী প্রসিকিউশন তৈরির তাগিদ দিয়েছেন সাবেক জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল ও প্রসিকিউশন) মঈদুল ইসলাম। তিনি জানান, বর্তমানে ৬৪ জেলাসহ বিভিন্ন স্থানে ৮৮টি আদালতে দুদকের বিচার চললেও সেগুলোতে সাধারণ মামলার চাপ থাকায় দুর্নীতির মামলা আলাদা গুরুত্ব পায় না এবং আসামিপক্ষও সময়ক্ষেপণ করে। দেশের আটটি বিভাগে অন্তত একটি করে এক্সক্লুসিভ বা বিশেষায়িত আদালত গঠন করা হলে প্রতিটি আদালতে ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ মামলা বণ্টন করে দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে দুদককে সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
এর পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ৩৩ ধারা অনুযায়ী দুদকের নিজস্ব স্থায়ী প্রসিকিউশন ক্যাডার গড়ে তোলার ওপর জোর দেন মঈদুল ইসলাম। রাজনৈতিক বিবেচনায় বা চুক্তিভিত্তিক আইনজীবী নিয়োগের বিদ্যমান ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে দক্ষ বিশেষজ্ঞ আইনজীবী তৈরি করা গেলে সঠিক তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে সাজা নিশ্চিতের হার ও বিচারের গতি উভয়ই বাড়বে বলে তিনি মনে করেন। তিনি উচ্চ আদালতের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে বিশেষায়িত আপিল আদালত গঠনেরও প্রস্তাব দেন।
এদিকে নতুন মামলার ক্রমবর্ধমান চাপ আদালতের ওপর সংকট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ২০২৫ সালে দুদক নতুন করে ৫৯৮টি মামলা দায়ের করে ২,৮৭২ জনকে আসামি করে এবং ৪১৩টি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করে। এসব মামলার বিচার শুরু হওয়ায় এবং পুরনো মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় জট ক্রমাগত বাড়ছে। তদন্ত ও প্রসিকিউশনের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং নিয়মিত পর্যালোচনাকে সংশ্লিষ্টরা আবশ্যক মনে করছেন।
কমিশনের বর্তমান স্থবিরতা কাটাতে জনবল দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। বিচারক মো. আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর অনুসন্ধান, তদন্ত ও বিচার ত্বরান্বিত করতে একাধিক সভা করেছে। বিশেষায়িত আদালত ও স্থায়ী প্রসিকিউশন গঠনের বিষয়ে আলোচনা হলেও তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান জানান, কমিশন বর্তমানে অনুমোদিত জনবলের মাত্র অর্ধেক নিয়ে কাজ করছে। বিদ্যমান কাঠামোতেই জনবল দ্বিগুণ করার সুযোগ রয়েছে। দ্রুত জনবল কাঠামো সংশোধন ও নতুন নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা বাস্তবায়িত হলে মামলা তদন্ত ও নিষ্পত্তির গতি বহুগুণ বাড়বে।





