রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে গুলিতে নিহত মোহাম্মদ ইসমাইলের নিথর দেহ বুঝে পেতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ‘মামলা করবেন না’ মর্মে স্বাক্ষর দিতে হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তার মা তাসলিমা আক্তার। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ উপস্থিত হয়ে তিনি এ মর্মস্পর্শী জবানবন্দি দেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দশম সাক্ষী হিসেবে ৩০ বছর বয়সী তাসলিমা আক্তার সাক্ষ্য প্রদান করেন। সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৮ জন এই মামলার আসামি।
প্রসিকিউশনের পক্ষে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত প্রসিকিউটর তারেক আব্দুল্লাহ্ জানান, মামলাটির ২৮ জন আসামির মধ্যে জাহাঙ্গীর কবির নানক ও শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৪ জনই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। বাকি চার আসামি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। এরা হলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখার সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, আনসার সদস্য ওমর ফারুক এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত যুবলীগ কর্মী ফজলে রাব্বি। আদালতে দাঁড়িয়ে শহীদ ইসমাইলের মা তার ছেলে হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন এবং প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকেও ট্রাইব্যুনালের কাছে ন্যায়বিচার ও আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রার্থনা করা হয়েছে।
জবানবন্দিতে নিহত ইসমাইলের মা তাসলিমা আক্তার জানান, ২০২৪ সালের ১৯শে জুলাই শুক্রবার জুমার নামাজ ও দুপুরের খাবার শেষে বিকেল ৩টার দিকে তার ছেলে মোহাম্মদ ইসমাইল ঢাকা উদ্যানের বাসা থেকে বের হয়ে আল্লাহ করিম মসজিদের পাশে গ্লাস ফ্যাক্টরির সামনে আন্দোলনে যোগ দেন। পরবর্তীতে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ইসমাইলের বন্ধু মনির বাসায় এসে জানান, তিনি ইসমাইলকে আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে দেখে বাড়ি ফিরে যেতে বলেছিলেন, কিন্তু ইসমাইল আন্দোলনস্থলেই থেকে যান। ওই সময় তাসলিমার ফোনে ব্যালেন্স না থাকায় তার বোন আকলিমা ইসমাইলের নম্বরে কল করেন। কয়েকবার চেষ্টার পর ইসমাইলের বন্ধু কালু ফোন ধরে জানান যে ইসমাইল গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
খবর পেয়ে তাসলিমা আক্তার তার মা ও বোনকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা উদ্যান থেকে রিকশায় ঢাকা মেডিকেলের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে রাস্তায় আগুন জ্বলতে দেখার পাশাপাশি কমিশনার আসিফ, কমিশনার রাজিব, জাহাঙ্গীর কবির নানক, তাপস ও বিপ্লবের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখতে পান বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। এমনকি গন্তব্যে যাওয়ার পথে তার চোখের সামনেই একজনকে গুলি করে হত্যা করা হতে দেখেন বলে আদালতকে জানান।
রাত আনুমানিক ১০টার দিকে তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান। তাসলিমা আক্তার বলেন, জরুরি বিভাগে বহু গুলিবিদ্ধ মানুষকে জীবিত ও মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন তারা। বিভিন্ন তলায় ছেলেকে খোঁজাখুঁজির পর এক চিকিৎসকের কাছে অনুরোধ করলে তিনি মোবাইল ফোনে একটি ছবি দেখান, যা দেখে তাসলিমা তার ছেলেকে শনাক্ত করেন। পরে মর্গে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তিনি ৩০০ থেকে ৪০০টি লাশ স্তূপাকারে পড়ে থাকতে দেখেন এবং পরনের পোশাক দেখে ছেলের লাশ নিশ্চিত করেন। ইসমাইলের মাথায় গুলি লেগেছিল।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মোহাম্মদপুর থানার ওসির উপস্থিতি ছাড়া লাশ হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানায়। পরদিন শনিবার সকাল ১১টার দিকে মোহাম্মদপুর থানা থেকে সাইফূল দারোগা হাসপাতালে আসেন এবং শনিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে ইসমাইলের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাসলিমা আক্তার জানান, লাশ নেওয়ার সময় হাসপাতাল থেকে ‘মামলা করবেন না’ মর্মে তার কাছ থেকে স্বাক্ষর রাখা হয়। পরবর্তীতে ছাতা মসজিদে জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে ইসমাইলকে দাফন করা হয়।
জবানবন্দি দেওয়ার সময় বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ে তাসলিমা আক্তার বলেন, তার ছেলেকে হত্যার জন্য শেখ হাসিনা, শেখ ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, কমিশনার আসিফ, কমিশনার রাজিব, রাসেল, মোল্লা রুবেল, কমিশনার আসিফের পিএস বিপ্লব, বিপ্লব কুমার, সৈকত, সাজ্জাদ পলাশ, সাত্তার, মোহাম্মদ ইসমাইল, রাষ্ট্রন ও রওশনসহ আরো অনেকেই দায়ী। তার মেয়ে রশ্নি তাকে ইউটিউবে ওই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও দেখিয়েছে এবং এলাকার লোকজনও ভিডিও দেখে এসব আসামির প্রত্যক্ষ জড়িত থাকার কথা নিশ্চিত করেছে বলে তিনি ট্রাইব্যুনালকে অবহিত করেন।





