কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগে বদলাবে দেশের অর্থনীতি

Published: October 12, 2026, 4:05 am

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেমন কম মূল্যায়িত অথচ উচ্চ সম্ভাবনাময় খাতে মুনাফার সুযোগ থাকে, বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষার অবস্থা ঠিক তেমনই। কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ করা প্রতিটি টাকা ভবিষ্যতে দক্ষ জনশক্তি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের মাধ্যমে বহুগুণে ফিরে আসার সম্ভাবনা রাখে। বর্তমানে প্রশ্নটি আর বিনিয়োগ করা হবে কি না তা নয়, বরং কত দ্রুত ও পরিকল্পিতভাবে এই বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব, সেটিই মুখ্য।

বিনিয়োগের রিটার্নের হিসাব করলে দেখা যায়, বিদেশগামী বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ এখনো স্বল্প বা আধা দক্ষ। ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী, বিদেশগামী বাংলাদেশিদের প্রায় ৪৩ শতাংশ স্বল্প দক্ষ এবং ৩৪ শতাংশ আধা দক্ষ। অর্থাৎ প্রতি দশজনের মধ্যে প্রায় সাতজন এমন দক্ষতা নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন, যা উন্নত প্রশিক্ষণ ও স্বীকৃত সনদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আরও উচ্চমূল্যে উপস্থাপন করা সম্ভব ছিল। এর ফলে শ্রমিকের সংখ্যা না বাড়িয়েই দেশের রেমিট্যান্স আয় বহুগুণ বৃদ্ধি করা যায়। বার্ষিক রেমিট্যান্স ইতিমধ্যে ৩০ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে, যা এই খাতের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

দেশের কারিগরি শিক্ষার অবকাঠামো ইতিমধ্যে বিস্তৃত হলেও এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। দেশে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ১২ হাজার ৯৩২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদিত ৩ হাজার ৪৪০টি ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬২১টিতে গত পাঁচ বছরে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি হয়নি। নতুন অবকাঠামো তৈরির পরিবর্তে বিদ্যমান এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক ও কর্মমুখী পাঠ্যক্রম, দক্ষ প্রশিক্ষক, পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ নিশ্চিত করে সেগুলোকে কার্যকর করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও দ্রুত ফলপ্রসূ।

জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর দ্বৈত প্রশিক্ষণব্যবস্থা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশেও শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরাসরি অংশীদারত্ব গড়ে তোলা প্রয়োজন। সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্প খাতকে যৌথভাবে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির দায়িত্ব নিতে হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তব কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন, যা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনবে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে অটোমেশন, রোবোটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং স্মার্ট উৎপাদন ব্যবস্থা কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। টেক্সটাইল, নির্মাণ, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়ছে। পলিটেকনিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন করে, তবে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

এছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের পলিটেকনিক, টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং কমিউনিটিভিত্তিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের তরুণ ও নারীদের এই উন্নয়নের সাথে যুক্ত করতে পারলে এর সুফল পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে। একজন তরুণ নিজের এলাকায় প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে উঠলে তা স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ তৈরি করে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করে।

পরিশেষে, কারিগরি শিক্ষায় সাহসী ও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ নয়, বরং ভবিষ্যতের বাংলাদেশে বিনিয়োগ। সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে একটি দক্ষ ও আত্মনির্ভরশীল প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব, যারা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo