মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা: বাস্তবায়ন কতদূর?

Published: October 8, 2026, 7:47 am

মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে আগামী ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আগামী ২৯ অক্টোবর (২৩ আশ্বিন থেকে ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। এ সময়ে দেশব্যাপী ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ এবং ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে প্রতিবছরের মতো এবারও মূল আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে একটিই প্রশ্নে—কাগজে-কলমে জারি করা এই নিষেধাজ্ঞা নদীতে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে?

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মৎস্য খাতে ইলিশের গুরুত্ব অপরিসীম। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের মোট ৫০.১৮ লাখ মেট্রিক টন মৎস্য উৎপাদনের মধ্যে ইলিশের অবদান ছিল ৫.২৯ লাখ মেট্রিক টন, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ওই অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। এমনকি ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ভরা মৌসুমেও চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা মোহনায় আশানুরূপ ইলিশ না পাওয়ার খবর জানিয়েছেন স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীরা। ফলে ইলিশ সম্পদের সুরক্ষায় প্রজনন মৌসুমের এই নিষেধাজ্ঞা সফল করা এখন সময়ের দাবি।

মা ইলিশ রক্ষা কেবল জাল জব্দের অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। চাঁদপুরের মেঘনায় ইলিশের বিচরণ কমে যাওয়ার পেছনে ডুবোচর, নদীর নাব্যতা সংকট এবং অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁদপুর নদীকেন্দ্র থেকে মেঘনায় অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন বন্ধে জেলা প্রশাসনকে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল। ২০২৬ সালে হাইমচরে অবৈধ বালু উত্তোলনের দায়ে ড্রেজার জব্দ ও জড়িতদের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও এই তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। ইলিশের নিরাপদ অভয়াশ্রম গড়তে নদীর পরিবেশ রক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

অভিযান সফল না হওয়ার পেছনে স্থানীয় পর্যায়ে কিছু অব্যবস্থাপনা ও প্রভাবশালীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চাঁদপুরের মতলব উত্তর থেকে হাইমচরের চরভৈরবী পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার এলাকাকে জাটকা সংরক্ষণের প্রধান অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে জাটকা নিধন অব্যাহত থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, অনেক সময় অভিযানের খবর আগেভাগে ফাঁস হয়ে যায়। এছাড়া আড়তদার ও মহাজনদের দাদন ব্যবসার চাপে পড়ে অনেক দরিদ্র জেলে নদীতে নামতে বাধ্য হন। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতহীনতা নিশ্চিত না হলে এবং কেবল সাধারণ জেলেদের শাস্তি দিয়ে প্রভাবশালী চক্রকে আড়ালে রাখলে এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।

৮ অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাওয়া এই নিষেধাজ্ঞা প্রশাসনের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। তথ্য ফাঁস ঠেকানো, আড়ত ও বাজারে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনার মাধ্যমেই কেবল এই অভিযানের সফলতা পরিমাপ করা সম্ভব। ইলিশ সম্পদ রক্ষা করতে হলে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। এই ২২ দিনের অভিযানের প্রকৃত মূল্যায়ন কাগজের প্রতিবেদনে নয়, বরং মেঘনার বুকেই প্রতিফলিত হবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin