বিশ্ব ডিম দিবস: ডিমের বৈজ্ঞানিক গুণাগুণ ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা

Published: October 9, 2026, 4:22 pm

আজ ৯ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডিম দিবস। এ বছর দিবসটির ৩০ বছর পূর্তি উদযাপিত হচ্ছে, যার আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘প্রোটিন, যা শক্তি দেয় ও সুরক্ষা করে’। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম। ডিম কেবল একটি সহজলভ্য পুষ্টিকর খাদ্যই নয়, বরং এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

ডিমের বহুমুখী স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত নতুন তথ্য দিচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ‘জার্নাল অব হিউম্যান নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটেটিকস’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২১টি ভিন্ন সমীক্ষার ৯৯ হাজার ৪৫৩ জন মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে দেখা গেছে, প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ গ্রাম ডিম খাওয়ার সঙ্গে বয়সজনিত জ্ঞানীয় অবনতি বা কগনিটিভ ডিক্লাইনের ঝুঁকি কমার সরাসরি ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। ডিমের কুসুমে থাকা ‘কোলিন’ মানবদেহে ‘অ্যাসিটাইলকোলিন’ নামক গুরুত্বপূর্ণ নিউরোট্রান্সমিটার তৈরি করে, যা মানুষের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও শেখার ক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণাতেও প্রবীণদের নিয়মিত ডিম খাওয়ার মাধ্যমে আলঝেইমারজনিত স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি কমার বিষয়টি উঠে এসেছিল।

ডিমের কোলেস্টেরল নিয়ে সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ভুল ধারণাও এখন ভেঙে যাচ্ছে। অনেকেই ক্ষতিকর মনে করে ডিমের কুসুম বাদ দিয়ে শুধু সাদা অংশ খান। অথচ কুসুমেই রয়েছে কোলিন, লুটেইন ও জেক্সানথিনের মতো অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদান। ২০২৫ সালে ‘দ্য আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল Nutrition’-এ প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বাড়ার পেছনে খাদ্যের কোলেস্টেরলের চেয়ে সম্পৃক্ত চর্বি বা স্যাচুরেটেড ফ্যাটই মূল ভূমিকা রাখে। তাই ডিমকে এককভাবে দায়ী না করে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া উচিত। এ ছাড়া লাল ও সাদা ডিমের পুষ্টিগুণে কোনো পার্থক্য নেই; খোসার রং মুরগির জাতের ওপর এবং কুসুমের রং তাদের খাবারের ওপর নির্ভর করে।

পুষ্টিমানের দিক থেকে ডিম অত্যন্ত সমৃদ্ধ। প্রায় ৫০ গ্রাম ওজনের একটি ডিম থেকে ৭০ থেকে ৭৫ কিলোক্যালরি শক্তি এবং sechs গ্রামের বেশি উচ্চমানের প্রোটিন পাওয়া যায়। এতে মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় ৯টি অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিডের পাশাপাশি ভিটামিন বি-১২, ভিটামিন এ, সেলেনিয়াম ও কোলিন থাকে। ডিমের প্রোটিন শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি এবং প্রবীণদের বয়সজনিত পেশিক্ষয় (সারকোপেনিয়া) রোধে অত্যন্ত কার্যকর। আবার কুসুমে থাকা লুটেইন ও জেক্সানথিন চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। তবে এটিকে অলৌকিক সমাধান না ভেবে সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্প গত দেড় দশকে এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবছরে দেশে ডিমের বার্ষিক উৎপাদন ছিল ৬০৮ কোটি, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় চার গুণ বেড়ে ২,৪৪১ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। দেশের নির্ধারিত ১,৮৫০ কোটি চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে মাথাপিছু বার্ষিক ডিমের প্রাপ্যতা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩৭টি। তবে এই উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছায়নি। ইউনিসেফ ও বিবিএসের ২০২৫ সালের জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের প্রায় ৬৫ শতাংশ এখনো চরম খাদ্যদারিদ্ব্যের শিকার। তাই শিশুদের অপুষ্টি দূর করতে এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য সম্পূরক খাবারে ডিম অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

উৎপাদনে বড় অর্জন থাকলেও পোলট্রি খাতের বাজার ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা সংক্রান্ত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পোলট্রি বাজারের সব ধরনের আর্থিক ও বাজারভিত্তিক ঝুঁকি এককভাবে প্রান্তিক খামারিদের বহন করতে হয়। পোলট্রি খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব এবং সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থার অভাবে খামারিরা প্রায়ই লোকসানের মুখে পড়েন, আবার ভোক্তাদেরও চড়া দামে ডিম কিনতে হয়। খামারিদের ন্যায্য মূল্য ও ভোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী দাম নিশ্চিত করতে পোলট্রি ফিডের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা আনা প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বাংলাদেশের পোলট্রি খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অতিরিক্ত গরমে ডিমের উৎপাদন কমে যায় এবং খোসা পাতলা হয়ে যায়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভবিষ্যতে তাপসহনশীল খামার ব্যবস্থাপনা, কঠোর জৈবনিরাপত্তা এবং খামারের বর্জ্য ব্যবহার করে বায়োগ্যাস ও সোলার পাওয়ারের মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকতে হবে। পাশাপাশি সনাতন পদ্ধতির বাইরে গিয়ে তরল ডিম (লিকুইড এগ), পাস্তুরিত উপাদান ও ডিমের গুঁড়া (এগ পাউডার) তৈরির মতো প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটানো প্রয়োজন। বেকারি, হোটেল ও তৈরি পোশাক খাতের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বাজারে এর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে মাননিয়ন্ত্রণ সাপেক্ষে ডিম রপ্তানির পথও উন্মুক্ত করতে পারে।

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক এ কে এম হুমায়ুন কবিরের মতে, বিশ্ব ডিম দিবসের ৩০ বছর পূর্তিতে আমাদের মূল অঙ্গীকার হওয়া উচিত বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে একদিকে যেমন শিশু, নারী ও প্রবীণদের পুষ্টির অধিকার নিশ্চিত করা, অন্যদিকে খামারিদের স্বার্থ রক্ষা করে পোলট্রি শিল্পকে পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও রপ্তানিমুখী অর্থনৈতিক খাতে রূপান্তর করা।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo