এক মিনিটের আড়াল, পুকুরে ডুবে প্রাণ হারাল শিশু আহমেদ

Published: October 10, 2026, 1:36 pm

গত ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুরবেলা দেবীদ্বারের ফুলতলী গ্রামে এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে খেলছিল ছোট্ট শিশু আহমেদ। হাঁটতে শেখার বয়সে চারপাশের জগতকে নতুন করে আবিষ্কারের নেশায় মগ্ন ছিল সে। তার মা নিপা আক্তার দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে সন্তানের দিকে নজর রাখছিলেন। কিন্তু জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো, সব সময় পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে না। মাত্র এক মিনিটের জন্য শিশুটি মায়ের চোখের আড়াল হয়েছিল।

নিপা আক্তার প্রথমে ভেবেছিলেন আহমেদ হয়তো খেলতে খেলতে একটু দূরে সরে গেছে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর মনে ভয়ের সঞ্চার হয়। শুরু হয় মরিয়া খোঁজ। বাড়ির সবাই মিলে চারদিকে খুঁজতে থাকেন, পুকুরপাড়েও দু-তিনবার খোঁজা হয়। কিন্তু কোথাও সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত পুকুরের পানিতে ভেসে ওঠে আহমেদের মরদেহ। মুহূর্তেই মায়ের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ।

আহমেদের এই মর্মান্তিক পরিণতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশে নদী, খাল, বিল ও পুকুরের ছড়াছড়ি। অনেক বাড়ির উঠান থেকে কয়েক পা ফেললেই পানি। এই পানি জীবন ও জীবিকার অংশ হলেও ছোট শিশুদের জন্য এটি বড় ঝুঁকি। বিশেষ করে এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে, কারণ তারা বিপদের গভীরতা বোঝে না, সাঁতার জানে না এবং বিপদে পড়লে সাহায্যের জন্য ডাকতেও পারে না।

ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৪ হাজারের বেশি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ এটি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০টি শিশুর জীবন এভাবে থেমে যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ইউনিসেফের সহযোগিতায় পরিচালিত জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর সব বয়সী প্রায় ১৯ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়, যার মধ্যে ১৪ হাজার ৫০০ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে বছরে প্রায় ১০ হাজারের মৃত্যু পানিতে ডুবে ঘটে।

পরিসংখ্যান বলছে, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ৮০ শতাংশই ঘটে পুকুরে এবং প্রায় ৮০ শতাংশ ঘটনা বাড়ি থেকে ২০ গজের মধ্যে ঘটে। এছাড়া প্রায় ৬০ শতাংশ মৃত্যু সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টার মধ্যে ঘটে, যে সময় অভিভাবকরা ঘরের কাজ বা জীবিকার কাজে ব্যস্ত থাকেন। আহমেদের ঘটনাটি এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।

ইউনিসেফ বলছে, এই মৃত্যু প্রতিরোধে পরিবার ও সম্প্রদায়ের সচেতনতা, শিশুদের সাঁতার ও পানিতে নিরাপত্তার দক্ষতা, নিরাপদ শিশুযত্ন এবং জাতীয় পর্যায়ে নীতিমালা ও বিনিয়োগ প্রয়োজন। সিআইপিআরবি সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য 'আঁচল' নামের এলাকাভিত্তিক দিবাযত্ন কেন্দ্র এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের সাঁতার ও উদ্ধার কৌশল শেখাতে 'সুইমসেফ' কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

সড়ক দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো নিয়ে যে মাত্রায় আলোচনা হয়, বাড়ির পাশের পুকুরে ডুবে শিশুর মৃত্যুকেও সেই গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। নদী বা পুকুর সরিয়ে ফেলা সম্ভব নয়, কিন্তু পানির সঙ্গে নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব। পরিবারকে একা এই দায়িত্ব বহনের পাশাপাশি সমাজ, স্থানীয় প্রশাসন ও রাষ্ট্রকেও যুক্ত হতে হবে। একটি শিশুর জীবন কখনোই এক মিনিটের আড়ালের কাছে হার মানার মতো ছোট নয়।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo