সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বাংলাদেশিদের জন্য দ্রুত কৃষি ভিসা দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া’ কিংবা ‘অভিজ্ঞতা ও ইংরেজি ভাষা ছাড়াই ১০-১৫ দিনে ভিসা’ সংক্রান্ত নানা চটকদার বিজ্ঞাপন ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বিষয় হলো, বাংলাদেশিদের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় সরাসরি কোনো কৃষি ভিসা নেই। দালাল চক্রের এই রমরমা বাণিজ্যটি মূলত একটি সুপরিকল্পিত ও ভয়ংকর প্রতারণার ফাঁদ।
এই গুজবের সূত্রপাত মূলত অস্ট্রেলিয়া সরকারের একটি নীতিগত সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে অস্ট্রেলিয়া সরকার বিদেশি তরুণদের ‘কাজ ও ভ্রমণ’ (ওয়ার্কিং হলিডে মেকার বা ডব্লিউএইচএম) ভিসার প্রক্রিয়াকরণ ধীর করে দেয়। এদিকে ফসল তোলার মৌসুম ঘনিয়ে আসায় স্থানীয় খামারিরা সংকটে পড়েন। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় কৃষক ফেডারেশনের হিসাব অনুযায়ী, খামারের প্রতি সাতটি কাজের একটি করে থাকেন এই ডব্লিউএইচএম ভিসাধারী তরুণেরা। খামারিদের তীব্র চাপের মুখে গত ১৭ সেপ্টেম্বর দেশটির জাতীয় প্রেসক্লাবে স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসনমন্ত্রী টনি বার্ক ঘোষণা করেন, দক্ষ কর্মীদের ভিসা প্রক্রিয়াকরণের অগ্রাধিকার তালিকায় কৃষি ও মৎস্য খাত যুক্ত হবে এবং প্রথম বছরের কাজ ও ভ্রমণ ভিসার আবেদন আবার স্বাভাবিক গতিতে নিষ্পত্তি করা হবে।
অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ‘খামারের জন্য দ্রুত ভিসা’ সংক্রান্ত এই খবরটিকেই বাংলাদেশের দালালেরা ‘বাংলাদেশিদের জন্য কৃষি ভিসা’ হিসেবে প্রচার করতে শুরু করে। অথচ এই ঘোষণা নতুন কোনো দেশের জন্য দরজা খোলেনি, বরং যাঁরা আগে থেকেই যোগ্য এবং নির্দিষ্ট দেশের নাগরিক, শুধু তাঁদের জন্যই প্রযোজ্য। একই বক্তৃতায় মন্ত্রী টনি বার্ক জানান, কাজ ও ভ্রমণ ভিসার দ্বিতীয় বছরের জন্য এখন থেকে লটারি হবে, যেখানে আসন সংখ্যা ৪৫ হাজার (গত বছর যোগ্য ছিলেন ৫৭ হাজার)। আর তৃতীয় বছরের আসন করা হয়েছে মাত্র ৫ হাজার, যেখানে গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৩১ হাজার। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়া তাদের অভিবাসন নীতি আরও আঁটসাঁট করছে।
প্রকৃতপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার খামারে বিদেশি শ্রমিক আনার মূল মাধ্যম হলো প্রশান্ত মহাসাগরীয় শ্রম চলাচল কর্মসূচি বা ‘পাম’ (PALM)। মন্ত্রী বার্ক নিজেই নিশ্চিত করেছেন যে কৃষির মূল ভিসা এটিই। তবে এই কর্মসূচিটি কেবল ৯টি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপদেশ ও তিমুর-লেস্তের জন্য উন্মুক্ত। দেশগুলো হলো—ফিজি, কিরিবাতি, নাউরু, পাপুয়া নিউগিনি, সামোয়া, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, টোঙ্গা, টুভালু ও ভানুয়াতু। এই কর্মসূচির আওতায় মৌসুমি কাজের জন্য সর্বোচ্চ ৯ মাস এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এক থেকে চার বছর থাকা যায়, যা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারি শ্রম প্রেরণ দপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই কর্মসূচির সরকারি ওয়েবসাইটে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, এতে যোগ দিতে কোনো টাকা বা উপহার দিতে হয় না এবং নিয়োগকর্তাই শুরুতে বিমানভাড়ার খরচ বহন করেন।
দালাল চক্র মূলত কাজ ও ভ্রমণ ভিসাকে (সাবক্লাস ৪১৭ ও ৪৬২) ব্যবহার করে প্রতারণা করছে। এই ভিসা কেবল নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের দেওয়া হয়, যার তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। প্রতিবেশী দেশ ভারত ২০২৪ সালে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তির আওতায় লটারির মাধ্যমে এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশিদের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় আসার বৈধ পথ হিসেবে পড়াশোনার ভিসা, দক্ষ অভিবাসনের ভিসা এবং নিয়োগকর্তার মনোনয়নে কাজের ভিসা রয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নিয়োগকর্তানির্ভর সাময়িক ভিসাটির নাম ‘চাহিদাসম্পন্ন দক্ষতা ভিসা’ (সাবক্লাস ৪৮২)। তবে এগুলোর জন্য অনুমোদিত পেশার তালিকা, দক্ষতার প্রমাণ, কাজের অভিজ্ঞতা, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা এবং বৈধ স্পনসর প্রয়োজন। ফল তোলা বা খেত পরিষ্কারের মতো সাধারণ কাজের জন্য বাংলাদেশ থেকে সরাসরি লোক আনার কোনো সুযোগ নেই।
কোনো ভিসা আসল কি না, তা যাচাই করা অত্যন্ত সহজ। ভিসা অনুমোদিত হলে অনুমোদনপত্রে একটি নম্বর থাকে, যা অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ভিসা যাচাই সেবা ‘ভেভো’ (VEVO)-তে মিলিয়ে দেখা সম্ভব। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনসংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়ার জন্য সরকারি নিবন্ধন থাকা বাধ্যতামূলক। কেউ যদি নিবন্ধিত অভিবাসন পেশাজীবীর নম্বর দেখাতে না পারেন বা ভিসার সাবক্লাস ও বিস্তারিত তথ্য না দিয়ে ‘১০ দিনে ভিসা’র প্রতিশ্রুতি দেন, তবে বুঝতে হবে সেটি প্রতারণা।
এই প্রতারণা রোধে বাংলাদেশের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং ক্যানবেরায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের নিয়মিত সতর্কবার্তা প্রচার করা জরুরি। দীর্ঘ মেয়াদে ‘কাজ ও ভ্রমণ’ ভিসার তালিকায় বাংলাদেশকে যুক্ত করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো যেতে পারে, যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা সহজ নয়। মিথ্যা আশায় দালালের হাতে সর্বস্ব তুলে দেওয়ার চেয়ে সচেতন থাকাই এই প্রতারণার ফাঁদ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।





