ছোটবেলায় সুনির্মল বসুর ‘হবুচন্দ্রের আইন’ কবিতাটি পড়েছিলাম, যেখানে রাজা হবুচন্দ্র তার মন্ত্রী গবুচন্দ্রকে ডেকে ফরমান জারি করেছিলেন যে রাজ্যের জনগণ যতই কষ্টে পড়ুক বা শোকে মরুক, কেউ কাঁদতে পারবে না। এই শাহি ফরমান অমান্য করলে গর্দান নেওয়ার হুমকির ফলে হাসপাতালে রোগী, কয়েদি এমনকি স্কুলের ছাত্ররাও যন্ত্রণায় হাসতে বাধ্য হতো। একপর্যায়ে জনগণের এমন অস্বাভাবিক আচরণ দেখে রাজা নিজেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে কেঁদে ফেলেন। ছোটবেলায় সেই কবিতা পড়ে মনে প্রশ্ন জেগেছিল—এমন পরিস্থিতি কি বাস্তবে সম্ভব? কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশে আমরা ঠিক তেমনই এক জাহেলিয়াত প্রত্যক্ষ করেছি, যেখানে পেটে ক্ষুধার কথা বললেও পুলিশে ধরে নিয়ে যাওয়ার ভয় ছিল কিংবা ২০৪১ সাল পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
ফ্যাসিবাদের সেই সময়ে এ দেশের জনগণ মন খুলে নিজেদের কষ্টের কথা বলতে পারত না। তখন কান্না ছিল কেবলই বোবা কান্না। তখন এক ভয়ংকর রানির উদয় হয়েছিল, যাকে কেউ হীরক রানি, কেউ কাঁঠাল রানি, কেউ দস্যু রানি বা মাফিয়া রানি বলে ডাকতেন। জাফর ইকবালদের মতো ব্যক্তিদের মাধ্যমে ‘চেতনার বয়ান’ তৈরি করে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো, যেখানে পাকিস্তানের নাম নিলেই দাঁত ব্রাশ করার মতো অদ্ভুত সব নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ৫ আগস্টের আগে মাফিয়া রানি পুরো জাতিকে টেরোরাইজ করে এবং স্টিমরোলার চালিয়ে শাসন করে গেছে। ৫ আগস্টের পর সেই অবস্থা থেকে জনগণ মুক্তি পেয়েছে এবং এখন খোলা মনে তাদের ক্ষোভ ও হতাশার কথা জানাতে পারছে।
তবে এখন বোবা কান্না থেকে সরব কান্নার যে উত্তরণ ঘটেছে, সেখানে পার্থক্য করতে ভুল করলে আমরা আবারও অন্ধকারের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যেতে পারি। আমাদের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে ফায়দা তোলার জন্য বিতাড়িত ডাইনি এবং তার দল ওত পেতে আছে। সবার প্রতি অনুরোধ, জল ঘোলা করে দেশ ও জাতির শত্রুদের হাতে অস্ত্র তুলে দেবেন না। আমি বর্তমান সরকারের সমালোচনা করছি বা সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের সব অপকর্মকে সমর্থন করছি তা নয়, বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি, তা নিয়ে আমার সংশয় আছে। জনগণ এখন তাদের ক্ষোভের কথা বলতে পারছে বলেই মনে হতে পারে পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে, কিন্তু আসলে আমরা সমস্যা সমাধানের পথে এক ধাপ এগিয়েছি।
সরকার বা নেতা-নেত্রীরা ভুল করতে পারেন, কিন্তু সেই ভুল সংশোধনের নামে আমরা যেন এমন কোনো ভুল পদক্ষেপ না নিই, যাতে বিতাড়িত শয়তান নতুন বয়ান ছড়ানোর সুযোগ পায়। অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি ফ্যাক্টর এখন এত প্রবল যে, আমরা সরকারের পক্ষে কোনো কথাই শুনতে প্রস্তুত নই। বর্তমান সরকার ব্যর্থ হলে আমরা কোথায় দাঁড়াব—এই সিরিয়াস প্রশ্নটি আমাদের ভাবতে হবে। বর্তমান সরকারপ্রধানের রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরতে গিয়ে আমি অনেক সময় শক্ত সমালোচনা করেছি। তিনি সব সময় তা খুশি মনে গ্রহণ করেননি, এমনকি নাখোশও হয়েছেন। তবুও তিনি আমাকে ব্লক করেননি, যা গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণে একটি আশাব্যঞ্জক বৈশিষ্ট্য। তিনি যে জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চান না, এই টক-ঝাল সম্পর্কের মাধ্যমে সেটিই ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
গত পঞ্চাশ বছরে দেশের রাজনৈতিক মাঠের দুই প্রতিপক্ষ ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। কিন্তু দেশের বিবেক হিসেবে পরিচিত সিভিল সোসাইটিকে ঠিকভাবে বিকশিত হতে দেওয়া হয়নি। একটি বিশেষ মতলব থেকে ‘সিভিল সোসাইটি’র অনুবাদ করা হয়েছে ‘সুশীল সমাজ’, যাতে গুটিকয় এলিটের মধ্যেই এর পরিধি সীমিত থাকে। সুলতানা কামালসহ গুটিকয় সুশীলকেই কুমিরছানার মতো বারবার উপস্থাপন করা হয়েছে। এরা পুরো সমাজকে চেতনার পক্ষে ও বিপক্ষে ভাগ করে ফেলেছিল। আমরা আশা করেছিলাম ৫ আগস্টের পর এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে আগের সেই অশুভ শক্তিই এখনো কলকাঠি নাড়ছে। আমরা চাই এমন একটি শক্তিশালী সিভিল সোসাইটি গড়ে উঠুক, যারা সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলার সাহস রাখবে।





