রুশ রাষ্ট্রনায়ক পোটেমকিনের একটি প্রচলিত গল্প দিয়ে কাফকার জগতের রূপরেখা বোঝা সম্ভব। কথিত আছে, তীব্র বিষণ্নতায় ডুবে থাকা পোটেমকিন দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি নথিপত্রে সই না করায় দপ্তরে কাগজের স্তূপ জমে গিয়েছিল। তখন শুয়ালকিন নামের এক সামান্য কেরানি অন্ধকার ঘরে ঢুকে তাকে দিয়ে একের পর এক কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে আনে। পরে দেখা যায়, প্রতিটি কাগজে শুয়ালকিনের স্বাক্ষর ছিল। এই গল্পটি যেন কাফকার জন্মের বহু আগে লেখা একটি কাফকাসুলভ আখ্যান, যেখানে দপ্তর, অন্ধকার ঘর, কাগজ এবং ক্ষমতার নাগালের বাইরে থাকা মানুষের অস্তিত্ব ফুটে ওঠে। কাফকার উপন্যাসের ‘কে.’ চরিত্রটি শুয়ালকিনের মতোই অসহায়, আর পোটেমকিন সেই অদৃশ্য ক্ষমতাধরদের পূর্বপুরুষ, যারা দুর্গের কক্ষে বা অজানা দপ্তরের অন্তরালে বসে থাকে।
কাফকার ক্ষমতাবান চরিত্ররা অদ্ভুতভাবে দুর্বল ও ক্লান্ত, তবুও তাদের একটি অঙ্গভঙ্গি বা নির্দেশ অন্য মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তাদের কাঁধে সাধারণ জিনিসের অসহনীয় ভার থাকে। জর্জ লুকাচ বলেছিলেন, ভালো টেবিল বানাতেও মানুষের মিকেলাঞ্জেলোর স্থাপত্যবোধ দরকার; কাফকার ক্ষেত্রে একটি দেয়াল সাদা করার কাজও যেন যুগের পর যুগ সরিয়ে নেওয়ার মতো বিশাল ঘটনা। তাঁর জগতে অঙ্গভঙ্গি কেবল শারীরিক ক্রিয়া নয়, বরং একটি ঘটনা। পিতার চরিত্রগুলোও একইভাবে ভারী এবং ক্লান্ত, যারা একই সঙ্গে অভিযুক্তকারী ও বিচারক। ‘দ্য জাজমেন্ট’ গল্পে পিতা হঠাৎ বিছানা থেকে উঠে সন্তানকে মৃত্যুদণ্ড দেন, যা ব্যক্তিগত সম্পর্ককে উত্তরাধিকার, অপরাধ ও বিচারের দীর্ঘ ইতিহাসে রূপান্তরিত করে।
কাফকার আইনের জগৎ প্রাগৈতিহাসিক এবং গোপন। ‘দ্য ট্রায়াল’-এর কে. বুঝতে পারে, মানুষকে অপরাধের চেয়েও ভয়াবহ অবস্থায়—অর্থাৎ কী অপরাধ তা না জেনেই—দণ্ড দেওয়া যায়। এখানে আইন আছে কিন্তু তা দেখা যায় না, আর বিচারকের মুখ অস্পষ্ট। কাফকার পৃথিবীতে সৌন্দর্য কোনো পুরস্কার নয়, বরং তা বিপদের কাছ থেকে আসে; অভিযুক্তদের মুখেই মানুষের গভীর সম্ভাবনা ফুটে ওঠে। ম্যাক্স ব্রডের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, কাফকা বলেছিলেন পৃথিবী ঈশ্বরের একটি খারাপ দিন এবং এখানে আশা আছে, কিন্তু তা মানুষের নাগালের মধ্যে নেই।
তবে কাফকার রচনায় ‘সহকারীরা’ বা অদ্ভুত দূতদের উপস্থিতি আশার ক্ষীণতম সংকেত বহন করে। তারা অসম্পূর্ণ এবং কোনো স্থির পরিচয়ে আবদ্ধ নয়। কাফকার মানুষ হয় ওঠে, নয় পড়ে; কেউ সম্পূর্ণ নয়। এই অসম্পূর্ণতাই তাদের মুক্তির একমাত্র সম্ভাবনা। তাঁর রচনায় পৃথিবী একটি বিশাল মঞ্চ, যেখানে মানুষ নিজের ভূমিকা পালন করে কিন্তু নাটকটির নাম জানে না। ওকলাহোমার ন্যাচার থিয়েটার বা আইনের দরজায় অপেক্ষা করা মানুষ—সবই নতুন রহস্য তৈরি করে। কাফকা রহস্যের সমাধান করেননি, বরং তার মধ্যে বাস করেছেন। তিনি জানতেন, মানুষ কোনো রহস্যের ব্যাখ্যা না পেয়েও তার অধীন হতে পারে।
কাফকার রচনায় বিস্মৃতি একটি গভীর শক্তি। ওড্রাডেক বা কুঁজো মানুষের মতো চরিত্রগুলো মানুষের ভুলে যাওয়া অংশের ধারক। ম্যালব্রঁশের ‘অ্যাটেনটিভনেস’ বা মনোযোগের দর্শনের মতো কাফকা মানুষের দিকে, প্রাণীর দিকে, ময়লা দপ্তরের দিকে, আদালতের দিকে, পরিবারের দিকে এবং ভুলে যাওয়া জিনিসের দিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করেছেন। তাঁর ‘নিউ অ্যাটর্নি’ গল্পের বুসেফালুস ঘোড়াটি আরোহীহীন অবস্থায় আইনবই পড়ছে, যা ন্যায়বিচারের দরজাকে ক্ষমতার চেয়ে অধ্যয়নের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে। মুক্তি এখানে কোনো বিজয় নয়, বরং ভারমুক্ত হওয়ার একটি মুহূর্ত। কাফকার পৃথিবী অন্ধকার হলেও নিস্তব্ধ নয়; সেখানে মানুষ নিজের অপরাধ না জেনেও ক্রমাগত চলতে থাকে, কারণ আমরা যে পৃথিবীকে বুঝতে পারি না, আমরা তারই অঙ্গ।
ওয়াল্টার বেঞ্জামিন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম মৌলিক চিন্তাবিদ ছিলেন, যার ‘ইলুমিনেশনস’ গ্রন্থে কাফকা ছাড়াও বোদলেয়ার, প্রুস্ত এবং ব্রেখটের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রয়েছে। ১৮৯২ সালের ১৫ জুলাই বার্লিনে জন্মগ্রহণকারী বেঞ্জামিন আধুনিক সমাজ, শিল্প ও প্রযুক্তির গভীর বিশ্লেষক ছিলেন। নাৎসিদের ভয়ে দেশ ছাড়ার পর ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বরে স্পেনের পোর্টবুতে তাঁর মৃত্যু হয়। দৈনিক এদিন তাঁর প্রবন্ধ ‘কাফকা: ল, গিল্ট, অ্যান্ড দ্য ইমপসিবিলিটি অব লিবারেশন’ বাংলাভাষী পাঠকের জন্য ভাষান্তর করেছে।





