অস্ট্রেলিয়ার নতুন অভিবাসন নীতি: বাংলাদেশিদের ওপর প্রভাব ও করণীয়

Published: September 21, 2026, 8:44 am

অস্ট্রেলিয়ার ঘরভাড়ার আকাশছোঁয়া বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার তীব্র ব্যয়ভার নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এখন চরমে। এই সংকটের পুরো দায় এসে পড়েছে অভিবাসীদের ওপর। এমন এক উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশটির অভিবাসন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক ক্যানবেরার ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে দাঁড়িয়ে অভিবাসনব্যবস্থার এক ব্যাপক সংস্কারের রূপরেখা ঘোষণা করেছেন। এই ঘোষণা কেবল সাধারণ প্রশাসনিক রুটিন নয়, এর পেছনে যেমন রয়েছে দীর্ঘদিনের ফাঁকফোকর বন্ধের তাগিদ, তেমনই রয়েছে আসন্ন ফেডারেল নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন লেবার সরকারের জনমত ধরে রাখার রাজনৈতিক চাল।

নতুন এই নীতিমালায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী অভিবাসীদের ওপর। কার্যকর হতে যাওয়া প্রধান পরিবর্তনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পরিবার আনার সুযোগ বন্ধ হওয়া। এখন থেকে নতুন আসা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা আর তাঁদের সঙ্গে স্বামী, স্ত্রী বা সন্তানদের আনতে পারবেন না। গ্র্যাজুয়েট ভিসার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। কেবল ডক্টরেট বা পিএইচডি পর্যায়ের গবেষকেরা এই কড়াকড়ির বাইরে থাকবেন। তবে যাঁরা ইতিমধ্যে পরিবার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন, তাঁদের পরিবার বিচ্ছিন্ন করা হবে না।

ভিসা বদলের ফাঁকফোকর বা ‘ভিসা হপিং’ পুরোপুরি বন্ধ করা হচ্ছে। আগে অনেকে পড়াশোনা শেষে দেশে না ফিরে বা স্থায়ী আবাসন (পিআর) পাওয়ার শর্ত পূরণ করতে না পেরে ভিসার মেয়াদ বাড়াতে অপেক্ষাকৃত নিচু স্তরের মানহীন কারিগরি বা ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হতেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষার্থীকে কেবল উচ্চতর স্তরের যোগ্যতায় যেতে হবে। যেমন স্নাতক শেষ করলে স্নাতকোত্তরে যাওয়া যাবে, কিন্তু ভিসা টিকিয়ে রাখতে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নিচের স্তরের ডিপ্লোমায় নামা যাবে না।

পর্যটক বা ভিজিটর ভিসায় বাধ্যতামূলকভাবে ‘অতিরিক্ত অবস্থানের সুযোগ নেই’ (নো ফারদার স্টে) শর্ত যুক্ত করা হচ্ছে। ফলে ভ্রমণের ভিসা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় এসে অনশোরে শিক্ষার্থী বা অন্য ভিসায় আবেদনের সুযোগ কার্যত শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া বৈধ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করা প্রায় ৭৭ হাজার অবৈধ ব্যক্তিকে শনাক্ত করে দ্রুত দেশত্যাগে বাধ্য করতে সীমান্ত রক্ষা বাহিনীতে নতুন ১০০ জন কর্মকর্তা নিয়োগ এবং মেলবোর্নের পুরোনো কোয়ারেন্টিন কেন্দ্র ব্যবহারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, তীব্র আবাসনসংকট মেটাতে নির্মাণ খাতের কারিগরি দক্ষতাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রির সমান পয়েন্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষকতা ও কৃষিশ্রমের মতো ঘাটতি থাকা খাতগুলোতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

প্রশাসনিক দিক থেকে দেখলে, গত দুই দশকে জন হাওয়ার্ডের সরকারের আমল থেকে অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসনব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ চাহিদাভিত্তিক। বাজারের ওপর সব ছেড়ে দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন খাতে অস্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা হু হু করে বেড়েছে। আজ অস্ট্রেলিয়ার কর্মক্ষম জনসংখ্যার প্রায় ১৬ শতাংশই অস্থায়ী অভিবাসী, যার সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখে পৌঁছে গেছে। ফলে আবাসন ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধার ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। সেই জায়গা থেকে অনিয়ম, অসৎ শিক্ষা এজেন্টদের দৌরাত্ম্য ও নামকাওয়াস্তে কলেজের ব্যবসা বন্ধ করতে নিয়মনীতি কঠোর করা একদিক থেকে যৌক্তিক।

তবে এই ঘোষণার পেছনে রাজনৈতিক চালও স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে কট্টর ডানপন্থী নেত্রী পলিন হ্যানসনের দল ‘ওয়ান নেশন’ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার করে এবং শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের আবাসনসংকটের ভয় দেখিয়ে জনপ্রিয়তায় বড় উল্লম্ফন ঘটিয়েছে। তারা ক্ষমতাসীন লেবার দলের ভোটেও ভাগ বসাচ্ছিল। এ অবস্থায় লেবার সরকার একদিকে ৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাত এবং নির্মাণ ও স্বাস্থ্য খাতের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে অভিবাসীদের সংখ্যায় বড় কোনো কাটছাঁট করেনি। মে মাসের বাজেটে ঘোষিত প্রাক্কলনকেই (চলতি অর্থবছরে ২ লাখ ৪৫ হাজার এবং পরবর্তী বছরে ২ লাখ ২৫ হাজার) কঠোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রূপ দেওয়া হয়েছে, যাতে ভোটারদের বোঝানো যায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

এই নতুন বাস্তবতা বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য এক বিরাট ধাক্কা। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার তরুণ অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। অনেক পরিবার জমিজমা বিক্রি করে কিংবা সঞ্চয় ভেঙে সন্তানদের পাঠান এই আশায় যে, সেখানে গিয়ে স্বামী বা স্ত্রী কাজ করে পড়াশোনার খরচ জোগাবেন এবং স্থায়ী হবেন। নতুন নিয়মে পরিবার আনার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিবাহিত শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক ও আর্থিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যাবে। একা একটি দেশে এসে আকাশছোঁয়া টিউশন ফি ও থাকার খরচ জোগাড় করা অনেকের জন্যই কঠিন হবে। তা ছাড়া ঢাকা ও অন্যান্য শহরের কিছু মধ্যস্বত্বভোগী এজেন্সির পক্ষ থেকে ‘ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে শিক্ষার্থী হওয়া যায়’ কিংবা ‘প্রাইভেট কলেজে ভর্তি হয়ে ভিসা নবায়ন করা যায়’ বলে যে চটকদার প্রচারণা চালানো হতো, তা একরাতের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেল।

এই পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে ঠান্ডা মাথায় বাস্তবতার মোকাবিলা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। প্রথমত, ঢাকায় বসে কোনো এজেন্টের কথায় বিশ্বাস করে ‘যেকোনো উপায়ে আগে অস্ট্রেলিয়া পৌঁছাই, পরে দেখা যাবে’—এই আত্মঘাতী ভাবনা মাথা থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে হবে। ভিসা বদল বা আপিলের দীর্ঘসূত্রতায় বছর পার করার দিন শেষ। দ্বিতীয়ত, যাদের চমৎকার একাডেমিক রেকর্ড, ভালো ইংরেজি দক্ষতা এবং পড়াশোনার খরচ চালানোর মতো বাস্তব আর্থিক সংগতি রয়েছে, কেবল তাঁদের জন্যই দরজা খোলা রয়েছে। যাঁদের মূল লক্ষ্য স্রেফ কাজ করা বা পরিবার নিয়ে থাকা, তাঁদের বর্তমান নিয়মে অস্ট্রেলিয়া না আসাই শ্রেয়।

তৃতীয়ত, যাঁরা শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হতে চান, তাঁদের অস্ট্রেলিয়ার শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার দিকে তাকাতে হবে। নির্মাণ প্রকৌশল, নার্সিং, স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষায়িত শিক্ষকতা ও প্রযুক্তিগত পেশাগুলোতে এখনো দক্ষ অভিবাসীদের তীব্র প্রয়োজন। তাই সাধারণ কোনো ব্যবসায়িক বা নামকাওয়াস্তে ডিপ্লোমা কোর্সে না গিয়ে সরাসরি অস্ট্রেলিয়ার অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা পেশাভিত্তিক বিষয়ে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করতে হবে। চতুর্থত, যে শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যে দেশটিতে অবস্থান করছেন, তাঁদের উচিত হবে কোনো অসৎ পরামর্শে সস্তা কোর্সে না গিয়ে নিজ নিজ মেধা দিয়ে মূলধারার পড়াশোনা শেষ করা এবং যত দ্রুত সম্ভব বৈধ পথে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করা।

অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে অভিবাসন এখন একটি কঠিন ফুটবলের মতো হলেও, দেশটির অর্থনীতির টিকে থাকার জন্যই দক্ষ মানুষ দরকার। তাই যাঁরা নিয়ম মেনে প্রকৃত মেধা ও স্পষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোবেন, তাঁদের পথ এখনো খোলা। কিন্তু ফাঁকফোকর খুঁজে টিকে থাকার দিন যে শেষ, ক্যানবেরার এই কঠোর বার্তায় তা নিয়ে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo