গোয়েন্দা ব্যর্থতায় হাতছাড়া শওকত আলীর পাচার করা ২৫ মিলিয়ন ডলার

Published: September 20, 2026, 2:35 am

বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউ-এর (বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট) সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে যুক্তরাজ্যে জব্দ হওয়া ২৫ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০৭ কোটি টাকা) হাতছাড়া হয়ে গেছে। ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর পাচার করা এই অর্থ লন্ডনের ইউবিএস এজি ব্যাংক থেকে কৌশলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির (এনসিএ) পক্ষ থেকে বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও বিএফআইইউ নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় আইনি ভিত্তি ও তথ্য সরবরাহ করতে পারেনি।

সংশ্লিষ্ট নথি থেকে জানা যায়, চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাজ্যের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা ঢাকার গোয়েন্দাদের জানায় যে এক বাংলাদেশি নাগরিকের বিপুল পরিমাণ অর্থ সে দেশে রয়েছে। পরবর্তীতে ৯ই ফেব্রুয়ারি এনসিএ তাদের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর নাম এবং লন্ডনের ইউবিএস এজি শাখায় তার ২৫ মিলিয়ন ডলার থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে। এই অর্থ প্রায় চার সপ্তাহ লন্ডনে আটকে ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপের প্রমাণ দিতে না পারায় চার সপ্তাহের আইনি বাধ্যবাধকতা শেষে যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ সেই অর্থ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

শওকত আলীর বিরুদ্ধে দেশে দুর্নীতি, অর্থ পাচার, কর ফাঁকি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আলাদাভাবে অনুসন্ধান চালাচ্ছিল। গত বছরের জুলাই মাস থেকে বিএফআইইউ-এর তত্ত্বাবধানে এই তদন্ত শুরু হয় এবং সাময়িকভাবে তার ব্যাংক হিসাব স্থগিত করা হয়। তবে এনসিএ যখন জানতে চায় শওকত আলীর বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের যোগসূত্র রয়েছে কি না বা দেশে তার কোনো সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে কি না, তখন বিএফআইইউ কোনো কার্যকর আইনি ভিত্তি তুলে ধরতে পারেনি।

এনসিএ ১৯শে ফেব্রুয়ারি এক বার্তায় জানায়, যুক্তরাজ্যে অর্থ আটকে রাখার প্রাথমিক মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা দরকার। জবাবে ২২শে ফেব্রুয়ারি বিএফআইইউ জানায়, শওকত আলী তাদের কাছে ‘পারসন অব ইন্টারেস্ট’ এবং তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। ২৫শে ফেব্রুয়ারি বিএফআইইউ আরও জানায়, শওকত আলী বিদেশে আছেন এবং দেশে আটক নেই। এনবিআরের যৌথ কর কমিশনার মোহাম্মদ দাউদ হোসেন, সিআইডির পরিদর্শক গোলাম সরোয়ার এবং দুদকের উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান নিজ নিজ সংস্থার পক্ষে তদন্ত করছেন। একই জবাবে বিএফআইইউ জানায়, ২০২৫ সালের ১লা জুলাই থেকে ২৯শে আগস্ট পর্যন্ত শওকত আলীর হিসাব সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়। তবে সে সময় পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের সঙ্গে ওই অর্থের সরাসরি যোগসূত্র বা সম্পদ ক্রোকের মতো দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ ছিল না।

এর মধ্যে ২৩শে ফেব্রুয়ারি এনসিএ কর্মকর্তা ইয়ান পোর্টার জানান, বাংলাদেশি তদন্ত সংস্থাগুলোর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির জন্য প্রয়োজনীয় ওএসজেএ (অপারেশনাল ব্যবস্থা) অনুমোদিত না থাকায় তথ্য বিস্তৃতভাবে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পরবর্তীতে ২৭শে ফেব্রুয়ারি এনসিএর আন্তর্জাতিক দুর্নীতি দমন সমন্বয় কেন্দ্র জানায়, তারা এ বিষয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেবে না। তবে বাংলাদেশ মামলা করে চার্জশিট দিলে তখনও যুক্তরাজ্য আদালতে যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু বিএফআইইউ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে অর্থ পাঠানোর বিষয়টি তুলে ধরে, যা যুক্তরাজ্যের আইনের পরিপন্থী ছিল না। কারণ যুক্তরাজ্যে ১৯৭৯ সালেই বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ বিধিনিষেধ বিলোপ করা হয় এবং ১৯৮৭ সালের ফাইন্যান্স অ্যাক্টের মাধ্যমে এক্সচেঞ্জ কন্ট্রোল অ্যাক্ট বাতিল করা হয়। ফলে দ্বিপক্ষীয় অপরাধের যোগসূত্র দেখাতে ব্যর্থ হয় বিএফআইইউ।

লন্ডনে অর্থ আটকে থাকার বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আসে গত ৮ই জুন, যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে এক বৈঠকে জানান যে যুক্তরাজ্যে ২৫ মিলিয়ন ডলারের ‘স্টোলেন অ্যাসেট’ জব্দ করা হয়েছে এবং তা দ্রুত ফিরিয়ে আনা হবে। তবে তার বক্তব্যের অনেক আগেই সেই অর্থ ফসকে দুবাই চলে যায়। ২৫শে আগস্ট হাইকোর্ট শওকত আলীর অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ অনুসন্ধানের আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে দুদককে নির্দেশ দেন এবং সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিএফআইইউ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে রুল জারি করেন।

বর্তমানে বিএফআইইউ সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে দুবাই থেকে এই অর্থ ফেরানোর চেষ্টা করছে। এদিকে, গত ১৫ই মার্চ এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট শওকত আলীর বিরুদ্ধে ৩০৬ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার কর দাবি করে ৩০শে মার্চের মধ্যে পরিশোধের সময় দিয়েছিল। কর পরিশোধ না করলে দেশে থাকা তার সম্পদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্র অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে গড়ে বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার করে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। পাচার করা অর্থ উদ্ধারে বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স কাজ করছে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin