বন্যপ্রাণী ৭৩% কমেছে, খাদ্য উৎপাদন বদলানোর আহ্বান ডব্লিউডব্লিউএফের

Published: October 8, 2026, 9:33 am

বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড (ডব্লিউডব্লিউএফ)। এই বিপর্যয় ঠেকাতে এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন ও ভোগের পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। ডব্লিউডব্লিউএফ সতর্ক করে বলেছে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তা কেবল পরিবেশেরই ক্ষতি করবে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপরও মারাত্মক আঘাত হানবে।

সংস্থাটির ২০২৬ সালের ‘লিভিং প্ল্যানেট রিপোর্ট’ অনুযায়ী, ১৯৭০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পর্যবেক্ষণ করা বন্য মেরুদণ্ডী প্রাণীর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর গড় আকার নাটকীয়ভাবে ৭৩ শতাংশ কমে গেছে। ৫ হাজার ৭৯০টি মেরুদণ্ডী প্রজাতির মোট ৩৫ হাজার ৮০৩টি বন্য জনগোষ্ঠীর তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকৃতির ওপর মানুষের সৃষ্ট এই চাপ কমার কোনো লক্ষণ এখনও দৃশ্যমান নয়।

আঞ্চলিক বিশ্লেষণে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি দেখা গেছে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে। সেখানে গত পাঁচ দশকে (১৯৭০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে) স্থল ও মিঠাপানির বন্যপ্রাণীর জনগোষ্ঠীর গড় আকার রেকর্ড ৯৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া আফ্রিকায় এই পতনের হার ৮০ শতাংশ এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ৪৯ শতাংশ। তুলনামূলক কম হলেও ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় ২৩ শতাংশ এবং উত্তর আমেরিকায় বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমেছে ২৮ শতাংশ।

বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তিতে বিচার করলে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে মিঠাপানির প্রাণীরা। নদী ও হ্রদের প্রাণীদের পর্যবেক্ষণ করা জনগোষ্ঠীর গড় আকার ৮৫ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে স্থলভাগের প্রাণীদের ক্ষেত্রে এই পতনের হার ৬৯ শতাংশ এবং সামুদ্রিক প্রাণীদের ক্ষেত্রে তা ৫৯ শতাংশ।

ডব্লিউডব্লিউএফের মতে, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের প্রধানতম অনুঘটক হলো কৃষি সম্প্রসারণ ও খাদ্য উৎপাদনের কারণে প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস ও অবক্ষয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত শিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, আগ্রাসী প্রজাতির অনুপ্রবেশ এবং বিভিন্ন রোগবালাই। তবে বিশ্বজুড়ে যেভাবে খাদ্য উৎপাদন ও ভোগ করা হচ্ছে, সেটিকেই জীববৈচিত্র্য হ্রাসের একক বৃহত্তম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, প্রকৃতির এই ক্ষতি কেবল পরিবেশগত সংকটেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও বিরাট ঝুঁকি তৈরি করছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় অর্ধেক, যা অঙ্কের হিসাবে প্রায় ৫৮ ট্রিলিয়ন ডলার, কোনো না কোনোভাবে প্রকৃতির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। ফলে বন্যপ্রাণী ও বাস্তুতন্ত্রের এই পতন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তা এবং মানুষের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডব্লিউডব্লিউএফের যুক্তরাজ্য শাখার প্রধান নির্বাহী তানিয়া স্টিল বলেন, প্রকৃতির এই ক্ষতি কেবল বন্যপ্রাণীর সংকট নয়। এর ক্ষতিকর প্রভাব ইতিমধ্যে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা, পানি সরবরাহ, অর্থনীতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর পড়তে শুরু করেছে। তিনি মনে করেন, বিশ্ব এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে হয় আমাদের প্রকৃতির এই ধ্বংসযজ্ঞের চড়া মূল্য দিতে হবে, অথবা প্রকৃতির পুনরুদ্ধারে বিনিয়োগ করে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থানের এক সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে হবে।

তবে এই হতাশার মধ্যেও কিছু আশার আলো দেখিয়েছে ডব্লিউডব্লিউএফ। বন্য বাঘ, সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপ ও বিভিন্ন প্রজাতির টুনার সংখ্যা বৃদ্ধির উদাহরণ দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সঠিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নিলে প্রকৃতির এই ক্ষয় রোধ করা সম্ভব। যেমন, ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বে বন্য বাঘের সংখ্যা ৩ হাজার ২০০ থেকে বেড়ে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ হয়েছে, যা শতকরা হিসাবে ৭০ ভাগের বেশি বৃদ্ধি।

এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণে ডব্লিউডব্লিউএফ প্রকৃতিবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার প্রবর্তন, খাদ্য অপচয় রোধ এবং বনভূমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস বন্ধ করার ওপর জোর দিয়েছে। পাশাপাশি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে জলবায়ু ও প্রকৃতি রক্ষায় নির্ভরযোগ্য পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের ধারাকে এমন সব কর্মকাণ্ডে পরিচালিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যা প্রকৃতি ধ্বংস না করে তা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে। সংস্থাটি মনে করে, সঠিক নীতি, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং সরকার, ব্যবসায়ী সমাজ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কেবল বন্যপ্রাণী ও বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার সম্ভব।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh