ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিরা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সীমান্ত অতিক্রম করে সৌদি আরবের সামরিক চৌকিগুলোতে একাধিকবার হামলা চালিয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দুর্গম পার্বত্য এলাকায় অবস্থিত সীমান্ত নিরাপত্তা চৌকিগুলোকে লক্ষ্য করে এসব অভিযান চালানো হয়। মিডল ইস্ট আইকে (এমইই) দেওয়া তথ্যে পশ্চিমা ও আরব কর্মকর্তারা জানান, গত অক্টোবরের শেষ দিকেও এমন অন্তত একটি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
পশ্চিমা এক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, অক্টোবরের শেষ দিকের সীমান্ত অভিযানের দৃশ্য নজরদারি সরঞ্জামে ধরা পড়েছে। এসব ছোট পরিসরের অভিযানে সৌদি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ব্যবহৃত বিশেষ ধরনের কিছু হালকা আগ্নেয়াস্ত্র দখল করে নিয়েছে হুতি যোদ্ধারা। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভাঙার পর এটিই সৌদি ভূখণ্ডের ভেতরে হুতিদের প্রথম সীমান্ত অতিক্রম করে হামলার ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অথচ ওই চুক্তির আগে ইয়েমেনের সীমান্তবর্তী শহর ও সেনাঘাঁটিতে নিয়মিত হামলা ও অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাত গোষ্ঠীটি।
ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) সহযোগী ফেলো মোহাম্মদ আল-বাশা জানান, তিনি সীমান্তে হুতিদের তৎপরতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তার মতে, হুতিরা হামলার তীব্রতা ও পরিধি ধাপে ধাপে বাড়াচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে তারা দূরপাল্লার ড্রোন ও স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করলেও দ্বিতীয় পর্যায়ে যুক্ত করা হয়েছে স্নাইপার অভিযান এবং মর্টার শেল নিক্ষেপে সক্ষম স্বল্পপাল্লার কোয়াডকপ্টার।
বাশা রিপোর্ট রিস্ক অ্যাডভাইজরির এই প্রতিষ্ঠাতা মনে করেন, হুতিরা আবার পুরোদমে স্থল অভিযান শুরু করবে কিনা তা সময়ের ব্যাপার মাত্র। প্রাথমিক অভিযানগুলো ইয়েমেনের ১২ বছরের যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোর মতো হতে পারে, যেখানে আকস্মিক হামলা চালিয়ে সরে পড়া, অস্ত্র ও সামরিক যানবাহন ধ্বংস করা এবং মোটরসাইকেল বা ছোট দলে এসে জোট সদস্যদের বন্দি করার কৌশল নেওয়া হতো।
সীমান্তের এই নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় সুরক্ষায় মিসর, পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে এমইই-কে জানিয়েছেন এক আরব কর্মকর্তা। মক্কা চুক্তির মিত্র তুরস্ক ও পাকিস্তান ইতোমধ্যে সৌদি আরবে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসহ সামরিক বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়া গত সপ্তাহে মিসরের পার্লামেন্টও দেশটিতে প্রতিরক্ষামূলক বাহিনী পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছে। অন্যদিকে, গত শনিবার সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি জানান, দামেস্কও এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে।
সীমান্তের এসব হামলায় ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সামরিক শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম হলেও তা সৌদি আরবের বিস্তীর্ণ সীমান্ত নজরদারির সীমাবদ্ধতা ও নিরাপত্তাঝুঁকিকে স্পষ্ট করে তুলেছে। ইয়েমেনে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী হুতিদের অগ্রযাত্রা থামাতে বর্তমানে হিমশিম খাচ্ছে। এর আগে সৌদি আরবের বেসামরিক অবকাঠামো, বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনায় হুতিদের বড় ধরনের হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত হন, যার জেরে রিয়াদ তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল।
সানাভিত্তিক হুতি প্রশাসন মূল সংঘাত ইয়েমেনের ভেতরে রাখলেও সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় আসির, জিজান ও নাজরান প্রদেশ নিয়ে তাদের ঐতিহাসিক দাবি রয়েছে। ১৯৩৪ সালের তায়েফ চুক্তির মাধ্যমে ইয়েমেন এলাকাগুলো সৌদির কাছে হস্তান্তর করলেও ভূখণ্ডগুলো নিয়ে হুতিদের দীর্ঘদিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা রিয়াদের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।





