‘সেদিন ক্যান্টনমেন্টের বাইরে গেলে জিয়া আর ফিরতেন না’: ব্রি. সাখাওয়াত

Published: November 7, 2026, 5:59 pm

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বন্দিদশা থেকে জিয়াউর রহমানকে উদ্ধারের কৃতিত্ব জাসদের নয় বলে দাবি করেছেন সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, জাসদের এই বয়ান সঠিক নয়; মূলত টু ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারিই তৎকালীন কর্নেল মহিউদ্দীন ও ফোর বেঙ্গলের সহায়তায় জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিল। যদি সেদিন জিয়াউর রহমান কর্নেল তাহেরের সাথে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে যেতেন, তবে তিনি আর কখনো ফিরে আসতে পারতেন না।

শনিবার জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতি (রাওয়া) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সাখাওয়াত হোসেন এসব তথ্য তুলে ধরেন। তিনি সেদিনের ঘটনাপ্রবাহের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ৭ নভেম্বর ভোর ৬টার দিকে তিনি টু ফিল্ডে গিয়ে দেখতে পান তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ডিরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশন্স (ডিএমও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল নুরউদ্দীন খানকে পাশে নিয়ে জিয়াউর রহমান ইউনিটটির অধিনায়কের কার্যালয়ে বসে আছেন। এর প্রায় আধা ঘণ্টা পর কর্নেল তাহের গণবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে সেখানে হাজির হন।

সাখাওয়াত হোসেনের বর্ণনামতে, কর্নেল তাহের সেখানে জিয়াউর রহমানকে তাদের সাথে বাইরে যেতে এবং সৈনিকদের সামনে ২১ দফা বা ১৭ দফা দাবি মেনে নেওয়ার কথা বলেন। তবে জিয়াউর রহমান সেই প্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে জানান, তিনি আগেই রেডিও ও টেলিভিশনে নিজের বক্তব্য পাঠিয়ে দিয়েছেন, ফলে কোথাও যাবেন না। ওই সময় টু ফিল্ড ও ফোর বেঙ্গলের সদস্যরা তাঁকে বাইরে যেতে দেননি। সাখাওয়াতের মতে, জিয়াকে বাইরে নিয়ে যেতে পারলে তাহের ও জাসদের একটি অংশ নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করত।

আলোচনায় সাখাওয়াত হোসেন সেদিনের কিছু অমীমাংসিত ইতিহাসের রহস্যও প্রকাশ করেন। তৎকালীন উত্তাল সময়ে কর্নেল হুদা কেন পুরো একটি ব্যাটালিয়ন (১০ বেঙ্গল) নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করেছিলেন, সেটির প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনো জানা যায়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই সাথে তিনি জিয়াউর রহমানের সততা, সাহসিকতা ও দূরদর্শিতার প্রশংসা করে জানান, হকি মাঠে লোডেড রাইফেল হাতে থাকা উচ্ছৃঙ্খল সৈন্যদের সামনে নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে জিয়া তাদের শান্ত করেছিলেন। এমনকি খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা ও হায়দারকে বাঁচানোর জন্য তিনি নওয়াজেশ উদ্দিনকে সরাসরি নির্দেশ দেন এবং সেনাবাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধাদের বিভেদ দূর করে ঐক্য ফিরিয়ে আনেন।

দেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, জিয়াউর রহমান ভারতকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি ভেঙে স্বাধীন নীতির সূচনা করেছিলেন। তিনি প্রথম সফর হিসেবে চীন বেছে নেন, মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সম্পর্ক জোরদার করেন এবং আল কুদস কমিটিতে ভূমিকা রাখেন। সাখাওয়াত আফসোস প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশ আজও স্বাধীন ও জোরালো পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে পারেনি। শর্তযুক্ত বিদেশি ঋণ পরিহার করে ইরানের মতো স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন। পাশাপশি গত ১৫ বছরে সামরিক বাহিনীর পেশাদারত্ব ও নৈতিকতা ক্ষুণ্ন করা হয়েছে বলে মন্তব্য করে তিনি পুনরায় চরম পেশাদারত্বে ফেরার আহ্বান জানান।

উক্ত আলোচনা সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোদাসসের হোসেন খান বীর প্রতীক। তিনি বলেন, স্বৈরাচার ও হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাজনৈতিক দলের চাপে তড়িঘড়ি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়ে জাতির ক্ষতি করেছেন। জনতা ও শিক্ষার্থীদের দেওয়া ম্যান্ডেট অনুযায়ী কাজ না করে নির্বাচন দেওয়াটা ড. ইউনূসের মস্ত বড় অপরাধ বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সভায় অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে আরও বক্তব্য উপস্থাপন করেন দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম, ভূরাজনীতি গবেষক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. আমিনুল করিম, রাওয়া চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম, প্রতিরক্ষা ও সামরিক বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট আবু রুশদ এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো. দেলোয়ার হোসেন খান।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh