ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো মানেই যেন এক রোমাঞ্চকর গল্প, যার গতিপথ কখনোই সোজা লাইনে চলে না। ৪১ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে পর্তুগালের এই মহাতারকা আবারও এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। সম্প্রতি নরওয়ের বিপক্ষে নেশনস লিগের ম্যাচে কোচ জর্জ জেসুস তাঁকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখার পর, ডেনমার্ক ম্যাচের একদিন আগে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান রোনালদো। তাঁকে ছাড়াই অবশ্য ম্যাচটি জিতেছে পর্তুগাল। তবে রোনালদোর এই প্রস্থানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় ধাক্কা খেয়েছে পর্তুগাল ফুটবল দল; তাদের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে চলে গেছেন ৫ লাখ অনুসারী। রোনালদো জানিয়েছেন, তিনি সঠিক সময়ে পর্তুগালের মানুষের কাছে ‘সত্যটা’ বলবেন। এদিকে কোচ জেসুস দাবি করেছেন রোনালদোর সঙ্গে তাঁর কোনো সমস্যা নেই এবং নিয়ম সবার জন্য সমান। তবে রোনালদোর ক্যারিয়ারের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিতর্ক ও শীতল লড়াই তাঁর দীর্ঘ ২০ বছরের পথচলার নিত্যসঙ্গী।
রোনালদোর এই বিতর্কিত অধ্যায়ের শুরুটা অনেক পুরোনো। ২০০৮ সালের জুলাইয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে যাওয়ার জেদ চেপেছিল তাঁর। তৎকালীন ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটারের সুরে সুর মিলিয়ে খেলোয়াড়দের আটকে রাখাকে ‘আধুনিক দাসত্ব’ বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি, যার কারণে রিয়ালে যেতে তাঁকে আরও এক বছর অপেক্ষা করতে হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে সান্ডারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের মাঝপথে হঠাৎ মাঠ ছেড়ে টানেলে চলে যান সদ্য প্রথম ব্যালন ডি’অর জয়ী এই ফরোয়ার্ড। তৎকালীন কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন তখন তাঁর নিতম্বের চোটের কথা বললেও রোনালদোর নিজের ইচ্ছামতো চলার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছিল। এরপর ২০০৯ সালের মে মাসে ম্যানচেস্টার ডার্বিতে গোল করার পরও ফার্গুসন তাঁকে পল স্কোলসের বদলি হিসেবে তুলে নিলে ডাগআউটে বসে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। সেটিই ছিল প্রথম দফায় রেড ডেভিলদের জার্সিতে তাঁর শেষ গোল।
রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রানাডার বিপক্ষে জোড়া গোল করেও কোনো উদযাপন করেননি রোনালদো। ম্যাচ শেষে রহস্য করে বলেছিলেন, ‘আমি পেশাগত কারণে দুঃখী, আর ক্লাব তা জানে।’ যদিও এক বছর পর নতুন চুক্তির মাধ্যমে সেই ক্ষোভের অবসান ঘটে। এরপর ২০১৩ সালের জুনে তৎকালীন রিয়াল কোচ জোসে মরিনিওর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের টানাপোড়েন চরম আকার ধারণ করে। কোপা দেল রের ম্যাচের পর ড্রেসিংরুমে ঝামেলা এবং শেষ দিকের ম্যাচগুলোতে বেঞ্চে বসে থাকার পর মরিনিও মন্তব্য করেছিলেন, ‘ক্রিস্টিয়ানো মনে করে সে সব জানে।’ ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে রাফা বেনিতেজ রিয়ালের কোচ হয়ে আসার পর তাঁর ট্যাকটিকস নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন রোনালদো। সাবেক কোচ কার্লো আনচেলোত্তির ভূয়সী প্রশংসা করে বেনিতেজের বিদায় ঘণ্টাও ত্বরান্বিত করেছিলেন তিনি।
২০২১ সালের আগস্টে জুভেন্টাসে তিন বছর কাটানোর পর উদিনেসের বিপক্ষে লিগের প্রথম ম্যাচে স্কোয়াডে না থাকায় শুরু হয় গুঞ্জন, যা তাঁকে পুনরায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে ফিরিয়ে আনে। তবে ওল্ড ট্রাফোর্ডে দ্বিতীয় অধ্যায়ও সুখকর হয়নি। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ব্রেন্টফোর্ডের বিপক্ষে কোচ রালফ রাংনিক তাঁকে তুলে হ্যারি ম্যাগুয়ারকে নামালে ক্ষোভে নিজের জার্সি ছুড়ে ফেলেছিলেন রোনালদো। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ম্যাগুয়ারের সঙ্গে তাঁর অধিনায়কত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বের গুঞ্জন ছড়ালে রাংনিক তা অস্বীকার করেন। এরপর ২০২২ সালের নভেম্বরে টটেনহামের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নামতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই ওল্ড ট্রাফোর্ড ছাড়েন তিনি। পরবর্তীতে পিয়ার্স মরগানকে দেওয়া এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে কোচ এরিক টেন হাগের প্রতি অসম্মান এবং ক্লাবের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগ এনে পারস্পরিক সমঝোতায় ক্লাব ছাড়েন রোনালদো।
ক্লাব ফুটবলের পর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও বিতর্কের ছায়া পড়ে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে নকআউট ম্যাচে তৎকালীন কোচ ফার্নান্দো সান্তোস তাঁকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখলে রোনালদোর জায়গায় নামা গনসালো রামোস হ্যাটট্রিক করেন। এ নিয়ে রোনালদোর সঙ্গী জর্জিনা রদ্রিগেজ ও বোন এলমা আবেইরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দেন। আর সর্বশেষ ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে নরওয়ের বিপক্ষে নেশনস লিগের ম্যাচে আবারও তাঁকে বেঞ্চে বসানোর সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি রোনালদো। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের এই শেষ লগ্নে এসেও রোনালদো বুঝিয়ে দিচ্ছেন, তিনি সবসময় নিজের নিয়মেই চলবেন। এখন ফুটবল বিশ্ব অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, কখন তিনি নিজের মুখ থেকে সেই ‘সত্য’ প্রকাশ করবেন।
ম্যাচ শেষে রহস্য করে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘আমি পেশাগত কারণে দুঃখী, আর ক্লাব তা জানে।’ অর্থের কারণে নয় দাবি করলেও, এক বছর পর নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে সেই অসন্তোষের পারদ কিছুটা নেমেছিল।.জুন ২০১৩: মরিনিওর সঙ্গে দ্বন্দ্ব২০১২-১৩ মৌসুমের শেষ দিকে রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে জোসে মরিনিওর সঙ্গে রোনালদোর সম্পর্কে টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মাঠ ছেড়ে যাওয়ার সময় জামা ছুড়ে ফেলে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও ম্যাচ শেষে ইউনাইটেড ৩-১ ব্যবধানে জয় পাওয়ায় কোচের কৌশলই সঠিক প্রমাণিত হয়।.ফেব্রুয়ারি ২০২২: অধিনায়কত্ব নিয়ে ঝামেলাসে বছরই ফেব্রুয়ারিতে রাংনিককে সংবাদমাধ্যমে এসে বলতে হয়েছিল যে রোনালদো ও ম্যাগুয়ারের মধ্যে অধিনায়কত্ব নিয়ে বিরোধের দাবিটি ‘সম্পূর্ণ অর্থহীন’।





