কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ, বাড়ছে ধর্ষণ ও হত্যা

Published: September 30, 2026, 5:07 am

বিশ্বজুড়ে কন্যাশিশুর অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে সোচ্চার থাকলেও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাপ্রবাহ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা, চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় চার বছরের ফারিয়াকে ধর্ষণ, পাবনায় চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যার পর লাশ টুকরো করা এবং সর্বশেষ আশুগঞ্জে সাত বছরের মাহিদার লাশ উদ্ধারের মতো ঘটনা অভিভাবক মহলকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ ও প্রাথমিক তথ্যে অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবেশী, আত্মীয় বা পরিচিতজনদের অপরাধী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে, যা ঘরের কাছের নিরাপত্তাকেও অনিশ্চিত করে তুলছে।

জাতীয় কন্যাশিশু দিবসের প্রাক্কালে বিভিন্ন সংস্থার প্রকাশিত তথ্য পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে তুলে ধরেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ১১৮ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ৪৬ জন ধর্ষণচেষ্টার সম্মুখীন হয়েছে। এ সময়ে ধর্ষণের পর ১৪ শিশুকে এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে আরও তিন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। আসকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে শিশু ধর্ষণের ঘটনা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগস্ট মাসে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। জুলাই মাসে নারী ও শিশু হত্যার ঘটনা ৫২টি থাকলেও আগস্টে তা ৯১টিতে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। একই সময়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ৭ থেকে ১২টিতে এবং ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ৩ থেকে ৫টিতে উন্নীত হয়েছে। জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৪০৯ জন নারী ও কন্যাশিশু হত্যার শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৩১ জন শিশু। একই সময়ে ৬৪৬ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৩৯৮ জনই কন্যাশিশু। এছাড়া রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে ১৩৯ জনের, যার মধ্যে ১১০ জন কন্যাশিশু এবং আত্মহত্যা করেছে ৯৫ জন কন্যাশিশু। ৭০টি জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্র এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে।

সহায়তার জন্য আবেদনের সংখ্যাও বাড়ছে। বাংলাদেশ চাইল্ড হেল্পলাইনের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শিশু যৌন হয়রানি-সংক্রান্ত ৫,৮৫৩টি কল এসেছে, যার মধ্যে ৫২০টি ছিল সরাসরি ধর্ষণের ঘটনা। চাইল্ড হেল্পলাইনের ব্যবস্থাপক চৌধুরী মো. মোহায়মেন জানিয়েছেন যে এ ধরনের কলের সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশের বিভিন্ন থানায় ৪,৬৫৪টি ধর্ষণ মামলা রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩,২৫২টি এবং জুলাই ও আগস্টে যথাক্রমে ৭০৭ ও ৬৯৫টি মামলা হয়েছে। গত বছরের মার্চ-জুন সময়ে ১,৫২৮টি মামলার তুলনায় এ বছর একই সময়ে ৪১২টি মামলা বেড়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন থানায় মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

মানবাধিকারকর্মীরা এই সহিংসতার পেছনে মাদকাসক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, অনলাইন পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা, নৈতিক শিক্ষার অভাব, সামাজিক বৈষম্য এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দায়ী করছেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, পারিবারিক সহিংসতা, দারিদ্র্য ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ পরিস্থিতিকে জটিল করছে। তিনি ভুক্তভোগী নারী ও কন্যার জন্য রাষ্ট্রকে দায়বদ্ধ করার আহ্বান জানান। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; আইনের কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগই কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০০০ সাল থেকে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এবারের প্রতিপাদ্য—‘শিশু বিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্ব জয়’। সংবিধান, জাতীয় শিশু নীতি-২০১১ এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে শিশুদের নিরাপত্তা ও বিকাশের অধিকার স্বীকৃত থাকলেও, তা বাস্তবায়নে অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত ও ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য আইনি ও মানসিক সহায়তা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) জুলাই ও আগস্ট মাসের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা বৃদ্ধির তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, আগস্টে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে মোট ৩২৭টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যেখানে জুলাইয়ে ছিল ৩০৬টি। অর্থাৎ এক মাসে প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি। আরো উদ্বেগের বিষয়, নারী ও শিশু হত্যার ঘটনা জুলাইয়ের ৫২টি থেকে আগস্টে বেড়ে ৯১টিতে দাঁড়িয়েছে—প্রায় ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি। একই সময়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ৭ থেকে বেড়ে ১২টি এবং ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ৩ থেকে বেড়ে ৫টিতে দাঁড়িয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যেও ধর্ষণ মামলার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশের বিভিন্ন থানায় ধর্ষণের অভিযোগে ৪৬৫৪টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৩২৫২টি। এর মধ্যে মার্চ-জুন সময়ে হয়েছে ১৯৪০টি। জুলাইয়ে ৭০৭ এবং আগস্টে ৬৯৫টি ধর্ষণ মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। গত বছরের মার্চ-জুনে ১৫২৮টি মামলা হয়েছিল। অর্থাৎ একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরে মামলা বেড়েছে ৪১২টি। এ সময় সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ মামলা হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন থানায়।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh