খালি চোখে সহজে দেখা যায় না এমন সব খুদে জীবের ছবি তুলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতি অর্জন করেছেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাংলাদেশি আলোকচিত্রী কুতুব উদ্দিন। তিনি ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের ২০২৬ সালের ৬২তম ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতায় পোর্টফোলিও বিভাগে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর পুরস্কারজয়ী এই গুচ্ছ ছবির সিরিজের নাম ‘সিক্রেট ওয়ার্ল্ড’, যেখানে ছয়টি ছবিতে স্লাইম মোল্ডের সূক্ষ্ম প্রজননকাঠামো ফুটে উঠেছে।
স্লাইম মোল্ড মূলত পচা কাঠ ও আর্দ্র পরিবেশে জন্মানো ছত্রাকজাতীয় জীব, যাদের আকার মাত্র ১ থেকে ২ মিলিমিটার। খালি চোখে সহজে নজরে না পড়লেও ম্যাক্রো লেন্সের সাহায্যে এদের সূক্ষ্ম গঠন, রং ও বিন্যাস ক্যামেরায় ধরেছেন কুতুব। ইংল্যান্ডের পশ্চিম সাসেক্সের বিভিন্ন বনাঞ্চলে ছবিগুলো তোলা হয়েছে। সিরিজের একটি ছবির নাম ‘টাইনি ড্যান্সার’ বা ‘খুদে নৃত্যশিল্পী’, যেখানে হলুদাভ পিচ্ছিল স্তরের ওপর সরু লালচে-বাদামি ডাঁটা এবং মাথায় কালো ছোপযুক্ত স্লাইম মোল্ডগুলোকে দেখে মনে হয় যেন তারা নাচছে। আরেকটি ছবি ‘আ ওয়ার্ল্ড ইন মিনিয়েচার’ বা ‘ক্ষুদ্র এক জগৎ’-এ শর্ষের দানার সমান একটি স্লাইম মোল্ডকে বনসাই গাছের মতো সাদা ফুলসহ ফুটে থাকতে দেখা যায়।
আলোকচিত্রের প্রতি কুতুবের যাত্রা শুরু হয় ২০১২ সালে, যখন স্ত্রী জমিলা পারভিন তাঁকে জন্মদিনে একটি ডিজিটাল ক্যামেরা উপহার দেন। শুরুতে শখের বশে প্রজাপতি, মৌমাছি, ফুল ও প্রকৃতির ছবি তুললেও ধীরে ধীরে তিনি পেশাদার আলোকচিত্রের দিকে ঝুঁকেন। কুরিয়ার সার্ভিসে ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ইউটিউব ও বিভিন্ন লেখা পড়ে তিনি ছবি তোলার কৌশল রপ্ত করেছেন। ২০১৮ সাল থেকে তিনি পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ছবি বিক্রি, কর্মশালা পরিচালনা এবং অন্যদের ছবি তোলা শেখানোর মাধ্যমে তিনি নিজের পরিচিতি গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমে তিনি ‘ম্যাক্রোম্যান’ নামে পরিচিত, যা তাঁর ছোট ছোট পোকামাকড়, ছত্রাক ও স্লাইম মোল্ডের সূক্ষ্ম গঠন নিয়ে কাজের প্রতি ভালোবাসার প্রতিফলন।
ছবি তোলার জন্য কুতুব ক্যানন আর ৫ ক্যামেরা ও ক্যানন এমপি-ই ৬৫ মিলিমিটার ম্যাক্রো লেন্স ব্যবহার করেন। আলোর নিয়ন্ত্রণে ছোট এলইডি বাতি ও ডিফিউজার ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন ফোকাস পয়েন্টে ছবি তোলেন, যা পরে জেরিন স্ট্যাকার সফটওয়্যারের মাধ্যমে একত্র করা হয়। একটি ভালো ছবির জন্য কখনো ৫০ থেকে ১২৪টি পর্যন্ত ছবি তুলতে হয়। কুতুবের মতে, সরঞ্জামের চেয়েও ধৈর্য ও পর্যবেক্ষণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি পশ্চিম সাসেক্সের স্লিন্ডন উডস, পুলবরো ব্রুকস ও হেসওর্থ কমনের মতো বনভূমিতে বৃষ্টির পর আর্দ্র পরিবেশে স্লাইম মোল্ড খুঁজে বের করেন।
২০২৪ সালের অক্টোবরে স্লাইম মোল্ড নিয়ে কাজ শুরু করা কুতুব ২০২৫ সালের প্রায় পুরো সময় এদের জীবনচক্র বুঝতে ও ছবি তুলতে ব্যয় করেছেন। এর আগে ২০২৫ সালেও তিনি একই প্রতিযোগিতায় ‘হাইলি কমেন্ডেড’ স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। বর্তমানে তাঁর এই পুরস্কারজয়ী ছবিগুলো লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হচ্ছে। দর্শকদের কাছ থেকে স্লাইম মোল্ড সম্পর্কে কৌতূহলী প্রশ্ন শুনে তিনি নিজের কাজকে সার্থক মনে করেন।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার সন্তান কুতুব ২০০৯ সালে পড়াশোনার জন্য যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। আগামী বছর বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। দেশে ফিরে তিনি বাংলাদেশের প্রকৃতিতে বিদ্যমান স্লাইম মোল্ড ও অন্যান্য ক্ষুদ্র অণুজীবের ছবি তোলার অপেক্ষায় আছেন। কুতুব উদ্দিনের মতে, বন্য প্রাণীর আলোকচিত্র মানেই শুধু বাঘ-সিংহের মতো বড় প্রাণী নয়, ক্ষুদ্র অণুজীবের জগতেও অসাধারণ গল্প লুকিয়ে থাকে, যা তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে তুলে ধরতে চান।
ভালো একটি ছবির জন্য কখনো ৫০, ১০০ কিংবা তারও বেশি ছবি তুলতে হয়।





