কারো প্রতি ভালো লাগা কাজ করা, প্রতিদিন কথা বলা কিংবা একসঙ্গ সময় কাটানোর পাশাপাশি নিজেদের সুখ-দুঃখের আবেগ ভাগ করে নেওয়া—সবই ঠিকঠাক চলে। তবুও সম্পর্কের ভবিষ্যৎ বা পরিচয়ের জায়গাটিতে থেকে যায় অস্পষ্টতা। একজন যখন সম্পর্কটিকে প্রেমের দিকে এগিয়ে নিতে চান, তখন অপরজন হয়তো বলেন, ‘এখন নয়, পরে দেখা যাবে।’ আধুনিক জীবনের সম্পর্কে তৈরি হওয়া এই অনিশ্চিত ও সিদ্ধান্তহীন অবস্থাকেই বলা হচ্ছে ‘মেবিলেশনশিপ’ (Maybelationship)।
ইংরেজি ‘মেবি’ (যার অর্থ হয়তো) এবং ‘রিলেশনশিপ’ (অর্থ সম্পর্ক)—এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে অনানুষ্ঠানিক শব্দটি তৈরি হয়েছে। এটি কোনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত মনোবৈজ্ঞানিক পরিভাষা নয়, বরং সমসাময়িক সম্পর্কগুলোতে দেখা দেওয়া সিদ্ধান্তহীনতাকে বোঝাতেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এ ধরনের সম্পর্কে দুজন মানুষের মধ্যে ভালো লাগা, ঘনিষ্ঠতা কিংবা আবেগীয় সংযোগ থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ প্রেমে রূপ নেবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে।
মেবিলেশনশিপ তৈরির পেছনে বিভিন্ন সামাজিক ও ব্যক্তিগত কারণ কাজ করতে পারে। পেশাগত অবস্থান মজবুত করা, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা কিংবা ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেকে তাত্ক্ষণিকভাবে কোনো দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারে জড়াতে চান না। আবার অতীতে কোনো সম্পর্কে ভেঙে যাওয়ার মানসিক আঘাত বা কষ্ট পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেও নতুন করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধা ও ভীতি কাজ করতে পারে।
কখনো কখনো দুজন মানুষের চাওয়াপাওয়ার ভিন্নতাও সম্পর্ককে মেবিলেশনশিপের দিকে ঠেলে দেয়। সম্পর্কে একজন হয়তো সুনির্দিষ্ট পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এগোতে চান, কিন্তু অন্যজন আরও সময় নিয়ে ধীরে সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী হন। ফলে সম্পর্কে টানাপোড়েন ও সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তবে তা নিশ্চিত রূপ লাভ করে না।
অনেক সময় একে ‘সিচুয়েশনশিপ’-এর সঙ্গে এক করে দেখা হলেও দুটির মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। সিচুয়েশনশিপে শারীরিক ও মানসিক ঘনিষ্ঠতা থাকলেও সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি বা স্পষ্ট পরিচয়ের চিন্তাই থাকে না। তবে মেবিলেশনশিপের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সম্পর্কটি পূর্ণতা পেতে পারে—এমন একটি সম্ভাবনা জিইয়ে রাখা হয়, কিন্তু মূল সিদ্ধান্তটি বারবার পিছিয়ে দেওয়া হয়। তবে বাস্তব জীবনে এই দুই ধারণার সীমারেখা সব সময় স্পষ্ট নাও হতে পারে এবং একই সম্পর্কে দুটি রূপই দেখা যেতে পারে।
সম্পর্কের শুরুতে একে অপরের দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিকতা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা বোঝার জন্য সময় নেওয়া স্বাভাবিক বিষয়। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্টতা না থাকা মানসিক চাপের সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ক্ষেত্রে খোলামেলা আলোচনা ও যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই। সম্পর্কে দুজনের প্রত্যাশা কী, কে কতটা দায়বদ্ধ হতে প্রস্তুত—এসব বিষয়ে পরিষ্কার কথা বলা জরুরি। কারণ একজনের সময় নেওয়ার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি অন্যজনেরও অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষায় না থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকে। মেবিলেশনশিপের মূল বিষয়ই হলো, সাময়িক ভালো লাগা আর দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি এক বিষয় নয়।





