বিয়ে হচ্ছে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। সৃষ্টির শুরু থেকে সব নবী-রাসুলই বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। এটি কেবল সমাজকে সুশৃঙ্খল ও সুন্দরই করে না, বরং আত্মীয়তার সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং পৃথিবীতে মানুষের সুন্দরভাবে আসার পথ প্রশস্ত করে। তবে বর্তমান সময়ে বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সংসার ভাঙন রোধ করে কীভাবে দাম্পত্য জীবনকে সুখময় ও উপভোগ্য করে তোলা যায়, তা নিয়ে গুরুত্বের সাথে ভাবার সময় এসেছে।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন, 'আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে একটি নিদর্শন হচ্ছে, তিনি তোমাদের জন্য স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন তোমাদের থেকেই; যাতে করে তোমরা প্রশান্তি লাভ করতে পার। আর তোমাদের পরস্পরের মধ্যে দিয়েছেন ভালোবাসা, দয়া ও রহমত।' ইসলামে স্ত্রী সৃষ্টির অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হলো স্বামীর মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করা, যার মধ্যে লুকিয়ে থাকে সুখ, শান্তি ও ভালোবাসা। দাম্পত্য জীবনে এই সুখ ধরে রাখতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মেনে চলা এবং ক্ষতিকর অভ্যাসগুলো বর্জন করা জরুরি।
দাম্পত্য জীবনে বড় একটি সমস্যা হলো একে অপরকে সময় না দেওয়া। অনেক সময় দেখা যায়, একই ছাদের নিচে থেকেও স্বামী-স্ত্রী নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন না। ঘরের মধ্যেও অফিসের কাজ বা ইন্টারনেট ব্যবহারে ব্যস্ত থাকছেন অনেকে। আবার রান্নাবান্না, সন্তানকে সময় দেওয়া, কাপড় ধোয়া বা ঘর গোছানোর মতো সংসারের অতিরিক্ত কাজের চাপে একে অপরকে দেওয়ার মতো সময় থাকে না। এই দূরত্ব ও একঘেয়েমি একসময় সংসার ভাঙার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর পাশাপাশি সাজসজ্জার ক্ষেত্রেও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। অনেক নারী ঘরে স্বামীর সামনে পরিপাটি থাকতে অনীহা দেখালেও বাইরে যাওয়ার সময় সাজগোজ করেন, যা সংসারে অশান্তি তৈরি করতে পারে। তাই ব্যস্ততার মধ্যেও স্বামীর পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে ঘরে পরিপাটি থাকা উচিত।
বিবাহিত জীবনে পারস্পরিক দায়িত্ব ও সম্মানবোধ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। একজন আদর্শ স্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব হলো স্বামীর অনুগত থাকা, তার সেবাযত্ন করা এবং তাকে শ্রদ্ধা করা। অথচ বর্তমান সমাজে অনেক ক্ষেত্রে স্বামীর সেবা করার বিষয়টিকে দাসত্ব হিসেবে আখ্যা দিয়ে অবহেলা করা হচ্ছে। অথচ অনেক নারীই বিমানবালা বা অন্যান্য চাকরিতে পরপুরুষের সেবায় কঠোর শ্রম দিচ্ছেন এবং সব নির্দেশ মেনে চলছেন, কিন্তু স্বামীর ক্ষেত্রে অনুগত থাকছেন না। অন্যদিকে, একজন আদর্শ স্বামীর দায়িত্ব হলো স্ত্রীর ভরণপোষণসহ যাবতীয় বৈধ ও সাধ্যের মধ্যকার চাহিদাগুলো পূরণ করা।
বিয়ে করার ক্ষেত্রে কেবল অর্থসম্পদ ও প্রাচুর্যকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত নয়। ধনাঢ্য পরিবারের মেয়েরা অনেক সময় উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা নানাবিধ শর্তের কারণে অল্প আয়ের স্বামীর সংসারে সুখী হতে পারেন না, যা বিচ্ছেদের পথ তৈরি করে। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, নারীদের চারটি গুণ দেখে বিয়ে করা হয়— সম্পদ, বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য ও ধার্মিকতা। এর মধ্যে ধার্মিকতাকেই অগ্রাধিকার দিতে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এছাড়া দাম্পত্য সুখের জন্য স্বামীর বাধ্য থাকা নারীর অন্যতম কর্তব্য। সুনানে তিরমিজির হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, তিনি যদি কাউকে সিজদা করার আদেশ দিতেন, তবে স্ত্রীকে তার স্বামীকে সিজদা করার নির্দেশ দিতেন। এমনকি স্ত্রী যদি রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকেন, তবুও স্বামীর ডাকে সাড়া দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে হাদিসে।
কর্মব্যস্ততার কারণে বর্তমানে অনেক স্বামী-স্ত্রী একে অপরের থেকে দূরে থাকছেন। এই দূরত্বের সুযোগে কর্মক্ষেত্রে বা অন্য কোথাও পরপুরুষ বা পরনারীর সঙ্গে অবাধ মেলামেশার মাধ্যমে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা যায়। এই অবৈধ সম্পর্কগুলো বৈধ দাম্পত্য জীবনকে বিষাদময় করে তোলে এবং সাজানো সংসারে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তাই সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য পরকীয়া থেকে দূরে থাকা এবং একে অপরের প্রতি অনুগত ও বিশ্বস্ত থাকা অপরিহার্য।





