হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি, পাকিস্তান ও তুরস্কের সম্মিলিত প্রতিরোধের ছক

Published: October 5, 2026, 5:34 am

হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের চলমান সংঘাত এক নতুন এবং জটিল মোড় নিতে যাচ্ছে। সম্প্রতি মক্কা চুক্তির অংশীদার তিন দেশ—সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সেনাপ্রধানদের মধ্যকার বৈঠক থেকে হুথিদের সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধের একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। ইয়েমেনের এই স্থানীয় যুদ্ধ কীভাবে আঞ্চলিক ক্ষমতা, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ ভারসাম্যের লড়াইয়ে রূপ নিচ্ছে, তা এখন স্পষ্ট। বিশেষ করে সৌদি আরবের রাজধানী লক্ষ্য করে হুথিদের সাম্প্রতিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধির একটি বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে কেবল সৌদির দুর্বলতা হিসেবে দেখলে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যাবে। রিয়াদের উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থান রয়েছে। এই হামলা সৌদি আরবকে বিচ্ছিন্ন করার বদলে বরং একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ও সম্মিলিত পদক্ষেপের অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। রিয়াদ এখন হুথিদের এই হুমকিকে একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে তুলে ধরে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোর সুরক্ষায় একটি ঐক্যবদ্ধ জোট গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে।

অন্যদিকে, লোহিত সাগরে সাম্প্রতিক সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে হুথিরা একটি সামগ্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চুক্তি নিশ্চিত করতে চাইছে। তারা সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া বেতন পরিশোধ, ইয়েমেনের তেল ও গ্যাস খাতের আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বন্দরগুলোর ওপর থেকে সব ধরনের বিধিনিষেধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। নিজেদের অনুকূলে রাজনৈতিক সমঝোতা আদায়ের লক্ষ্যে তারা সরাসরি সামরিক চাপ প্রয়োগ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কৌশলগত অবস্থান প্রতিকূলে যাওয়ার আগেই তারা দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা নিশ্চিত করতে চায়।

হুথিদের লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব তাদের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’-এর ওপর নির্ভর করে আসছিল, যাতে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হলেও সরাসরি লোহিত সাগরে তেল পরিবহন করা যায়। এখন হুথিরা ঠিক সেই বিকল্প পথটিকেই লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে সৌদি তেল কোম্পানি আরামকোর জিজান ও ইয়ানবুতে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে।

এই ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় অর্থনৈতিক বিষয়গুলোও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সস্তায় তৈরি বিপুল সংখ্যক ড্রোন ভূপাতিত করতে সৌদি আরবকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও অত্যাধুনিক ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে একটি বড় অর্থনৈতিক বোঝা। এছাড়া মারিব এলাকায় সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, আকাশে নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখা অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ। তবে রিয়াদ এখন মিসর, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো মিত্রদের সঙ্গে একটি সমন্বিত ও বহুপক্ষীয় প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে এই একক সামরিক চাপকে একটি যৌথ আন্তর্জাতিক দায়িত্বে পরিণত করছে।

পবিত্র মক্কা নগরীকে কেন্দ্র করে জনমত গঠনের লড়াইও তীব্র হয়ে উঠেছে। রিয়াদ দাবি করেছে, তারা মক্কার উদ্দেশ্যে ধেয়ে আসা একটি ড্রোন মাঝপথে ধ্বংস করেছে, যদিও হুথিরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মক্কার সুরক্ষার বিষয়টিকে সামনে এনে সৌদি আরব সমগ্র মুসলিম বিশ্বের অটল সমর্থন আদায়ে সফল হয়েছে। যেমন পাকিস্তান ইতিমধ্যেই সৌদি আরবের sovereignty বা সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তেহরানকে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছে। ইসলামের পবিত্রতম স্থানের সুরক্ষাকে সামনে রেখে রিয়াদ সফলভাবে একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জোট গড়ে তুলেছে।

এই আঞ্চলিক উত্তেজনার নেপথ্যে ইরানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তেহরানের এক কর্মকর্তা হুথিদের ওপর নিয়ন্ত্রণের দাবি অস্বীকার করলেও অন্য একটি সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক হামলার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ তেহরান থেকেই এসেছিল। মূলত, ইরান ইয়েমেনের এই সংঘাতকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের বৃহত্তর আলোচনার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। ফলে এই যুদ্ধের মাশুল রিয়াদকে গুনতে হলেও তা পরোক্ষভাবে ইরানের ভূরাজনৈতিক স্বার্থই রক্ষা করছে।

ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির দিকে তাকালে তিনটি প্রধান বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, সৌদি আরব তাদের সামরিক কৌশল নতুন করে সাজাচ্ছে। ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী উপকূলীয় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর, সানা শহরে সৌদি স্থল অভিযানের সম্ভাবনা খুবই কম। দীর্ঘস্থায়ী কোনো স্থলযুদ্ধে জড়ানোর পরিবর্তে রিয়াদ এখন আন্তর্জাতিক মিত্রদের গোয়েন্দা তথ্য ও লজিস্টিক সহায়তার ওপর ভিত্তি করে সীমিত পরিসরে সুনির্দিষ্ট বিমান হামলা চালানোকেই উপযুক্ত মনে করছে।

দ্বিতীয়ত, সৌদি, পাকিস্তান ও তুরস্কের সেনাপ্রধানদের বৈঠকের পর হুথিদের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের জবাব সম্মিলিতভাবে দেওয়ার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। তৃতীয়ত, ইয়েমেন যুদ্ধ এখন মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বৃহত্তর আলোচনার সঙ্গে যুক্ত। কাতার ও পাকিস্তানের মতো মধ্যস্থতাকারীরা ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। লোহিত সাগর ও ইয়েমেনে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি শেষ পর্যন্ত এই বৈশ্বিক চুক্তির ওপরই নির্ভর করবে।

২০২২ সালের যুদ্ধবিরতিটি মূলত সৌদি আরবের জন্য একটি সম্মানজনক প্রস্থান কৌশল (exit strategy) ছিল, যাতে হুথিরা আর্থিক সুবিধা নিয়ে আঞ্চলিক আগ্রাসন বন্ধ করে। কিন্তু হুথিরা এখন এমন এক স্থায়ী শক্তিতে পরিণত হতে চায়, যা রিয়াদকে আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নিতেই হবে। রিয়াদের ওপর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে তারা সেই আগ্রাসী জানান দিচ্ছে। জবাবে সৌদি আরবও স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, তারা একা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে না, বরং এটিকে একটি দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত সংঘাত থেকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার বিষয়ে রূপান্তর করছে।

প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯: ৫০আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০: ০৩

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh